বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও ভারতের কূটনীতিতে নতুন গতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ১১ বার
বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও ভারতের কূটনীতিতে নতুন গতি

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক জটিল ও পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও নতুন করে কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে নয়াদিল্লি। সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নে এমনটাই জানিয়েছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজ্যসভার সদস্য হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক পাঁচ দেশের সফর ভারতের বৈশ্বিক কূটনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

গত ১৫ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি—এই পাঁচ দেশে মোদির সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। শ্রিংলা মনে করেন, বিশ্ব যখন একাধিক সংকটে ব্যস্ত, তখন ভারত তার অবস্থানকে “নির্ভরযোগ্য অংশীদার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরকে তিনি সবচেয়ে ফলপ্রসূ অংশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমিরাত ভারতের অর্থনীতির প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে এবং প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো গঠনের কাজ শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সামরিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নেদারল্যান্ডস সফর প্রসঙ্গে শ্রিংলা বলেন, উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং আধুনিক শিল্প অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ডাচদের অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উৎপাদন সহযোগিতা বাড়লে ভারতের শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখবে।

উত্তর ইউরোপের দেশ সুইডেন ও নরওয়ের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও এই সফরের মাধ্যমে নতুন গতি পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে সবুজ হাইড্রোজেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং টেকসই জ্বালানির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। শ্রিংলার মতে, এই অংশীদারিত্ব ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত কার্যকর হবে।

নরওয়ে সফরকে তিনি একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেন। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুনভাবে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। নরওয়ের বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতের সবুজ জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ইতালির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই সফর নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ইতালির সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানো ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকদের মত।

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতকে অনেক দেশ এখন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই সফরের মাধ্যমে ভারত শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেনি, বরং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় শক্তিশালী কূটনীতি শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দেশটিকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত