প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । আন্তর্জাতিক ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের ঘটনায়। মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে ইরানের ভূখণ্ডে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন দাবি করেছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থা ‘যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড’ (সেন্টকম)। এর পরপরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ফলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণ স্থাপনা এবং উপকূলীয় রাডার সাইট লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। সেন্টকমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করেছে।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনা লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থাকে টার্গেট করা হয়েছে।
মার্কিন হামলার খবর প্রকাশের পরপরই দক্ষিণ ইরানের সিরিক বন্দরের আশপাশে বিস্ফোরণ ও সামরিক তৎপরতার খবর সামনে আসে। এর জবাবে আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনার মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে আবারও কোনো হামলা হলে এর প্রতিক্রিয়া আরও ব্যাপক হতে পারে।
দুই দেশের এই মুখোমুখি অবস্থান এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারক কার্যকর থাকার কথা ছিল। ওই সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালিতে কঠোর অবস্থান নেয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। এই পথ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে হামলার ঘটনা। বৃহস্পতিবার ওই জাহাজে ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। ওয়াশিংটন ঘটনাটিকে সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। যদিও তেহরান সরাসরি এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
জাহাজে হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া ১১ হাজারের বেশি নাবিককে উদ্ধারের জন্য জাতিসংঘ যে মানবিক কার্যক্রম শুরু করেছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে বাণিজ্যিক নৌযান পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ওমান একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ওমান জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সঙ্গে সমন্বয় করে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ওমানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই কোনো ধরনের ফি ছাড়াই নির্দিষ্ট সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলাচল করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মহল দুই দেশের প্রতি সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, একটি আঞ্চলিক সংঘাত কত দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে। এখন সবার নজর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সামরিক উত্তেজনা কমে আলোচনার পথ তৈরি হবে, নাকি নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে—সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।