মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । জাতীয় ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঠেকাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ—এমন মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি উদ্যানে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়; এর নেতিবাচক প্রভাব পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজের জীবনই ধ্বংস করেন না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবারও নানা সংকটের মধ্যে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষমতা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর মাদকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদক গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান মাদক সমস্যার ভয়াবহতা তুলে ধরছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মাদক পাচারকারী চক্রগুলো আগের তুলনায় আরও সংগঠিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপটেড যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তারা বিশেষ করে তরুণদের টার্গেট করছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরোধ ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। মাদক উৎপাদন, সরবরাহ এবং পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ মানুষের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে এর ব্যবহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, মাদক প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি এবং মাদকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানানো জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম, বিলবোর্ড স্থাপন এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। পরিবার থেকেই সন্তানদের প্রতি নজর রাখা, তাদের মানসিক বিকাশে সহযোগিতা করা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে হতাশা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন তাদের শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি জানান, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও সামাজিক পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। কারণ একজন মানুষকে মাদকমুক্ত করে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা একটি বড় মানবিক দায়িত্ব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদকের বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, শুধু কঠোর শাস্তির মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি; বরং শিক্ষা, সচেতনতা, চিকিৎসা এবং সামাজিক সহযোগিতার সমন্বিত উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ শক্তি। তাই তাদের মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম বড় দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তরুণদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিবারে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করাও মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে একটি সর্বব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠলে এই সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের পথ তৈরি করতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত