প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । আন্তর্জাতিক ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। দেশটিতে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া এবং নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
শুক্রবার এক সরকারি বৈঠকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভূমিকম্পের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি অনেক মানুষকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
দেশটির বিভিন্ন এলাকায় শত শত ভবন ধসে পড়েছে। অনেক পরিবার রাতারাতি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের খোঁজে অসংখ্য মানুষ ঘটনাস্থলে অপেক্ষা করছেন। কোথাও চলছে কান্না, কোথাও চলছে স্বজন হারানোর শোক, আবার কোথাও চলছে জীবিত কাউকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে দেশজুড়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে তৈরি একটি ওয়েবসাইটে স্বজনরা নিখোঁজদের তথ্য জমা দিয়েছেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের নিখোঁজ থাকার তথ্য জমা পড়ে।
উদ্ধারকারী দলগুলো ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তবে ভূমিকম্পে সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
ভূমিকম্পটি আঘাত হানে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায়। রাজধানী কারাকাস এবং আশপাশের এলাকায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং পরবর্তী কম্পনের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। পরপর এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রচণ্ড কম্পনের কারণে বহু আবাসিক ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় ভবন ধসে পড়ে মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেখা দেয় বড় ধরনের সমস্যা। দুর্যোগের পরপরই আতঙ্কিত মানুষ খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটির গাণিতিক মডেল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা এবং কয়েক দিন উদ্ধার কাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অনেক মানুষ পর্যাপ্ত বাতাস ও পানি পেলে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারেন। তাই দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
ভেনেজুয়েলার সরকার জানিয়েছে, জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছে। আহতদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
দুর্যোগের পর মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তাদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের পর শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
ভেনেজুয়েলার এই দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, শক্তিশালী ভূমিকম্প কত দ্রুত একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন দুর্যোগের প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও সহায়তার প্রত্যাশা করছে ভেনেজুয়েলা। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে বিভিন্ন সংস্থা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো।
দেশটির মানুষ এখন অপেক্ষা করছেন আরও সুসংবাদের জন্য—যেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আরও জীবিত মানুষ ফিরে আসেন, যেন হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের খোঁজ মেলে এবং যেন বিপর্যস্ত জনপদ আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।