মোংলা নদীতে ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । জাতীয় ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার পর মোংলা নদীতে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এখন থেকে নদী পারাপারে আর জোয়ারের ওপর নির্ভর করতে হবে না স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের। মোংলা নদীতে ২৪ ঘণ্টা দুইটি ফেরি চলাচল কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্যোগে মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের কর্মজীবী মানুষসহ সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শনিবার সকালে মোংলা বন্দরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ফেরিঘাটে ফুলটাইম ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মোংলা নদী পারাপারে এতদিন যে দুর্ভোগ ছিল, তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছিল। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০০৩ সালে মোংলা নদীতে ফেরি চলাচল শুরু হলেও এতদিন এটি পূর্ণ সময়ের জন্য চালু ছিল না। শুধু জোয়ারের সময় ফেরি চলাচল করত, আর ভাটার সময় বন্ধ থাকত। ফলে জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, রোগী, শিক্ষার্থী এবং পণ্য পরিবহনকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তেন।

তিনি বলেন, এখন থেকে দুটি ফেরি সার্বক্ষণিক চলাচল করবে। এতে মোংলা বন্দর, ইপিজেড এবং শিল্প এলাকার সঙ্গে আশপাশের জনপদের যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মোংলা নদীর ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। নদীর এক পাশের মানুষকে অন্য পাশে যেতে এতদিন জোয়ার-ভাটার সময়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে ফেরি না পাওয়ায় কর্মস্থলে পৌঁছানো, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হতো।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল শুরু হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা ও রামপাল এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজ হবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এই ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে জয়মনি এলাকার খাদ্যগুদাম থেকে পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমে গতি আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ফেরি সার্ভিস ভবিষ্যতে লাভজনক পরিবহনে পরিণত হবে।

অনুষ্ঠানে ফেরিঘাটে ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে টাঙানোর নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নেওয়া যাবে না। ভাড়ার তালিকা না থাকলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়েন। সরকার সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করছে। উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অনুপ দাস, বাগেরহাট সড়ক ও জনপদের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক, মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার প্রশাসক শারমিন আক্তার সুমি, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মোংলা নদীর ফেরি সার্ভিস নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে ফেরি না চলায় অনেক সময় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। বিশেষ করে রাতের সময়ে জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। মোংলার মতো বন্দর ও শিল্পকেন্দ্রিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ শুধু মানুষের চলাচল নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল চালু হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মোংলা বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরগুলোর একটি। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কাজ করেন। তাদের সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফেরি সার্ভিসের সফলতার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং যাত্রীসেবার মান বজায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, মোংলা নদীর ওপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সেতু বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত দুটি ফেরি ২৪ ঘণ্টা চলাচল করবে। সেতু নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ ২৩ বছর পর মোংলা নদীতে ফুলটাইম ফেরি সার্ভিস চালু হওয়াকে স্থানীয়রা একটি বড় স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এখন তাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগই কমাবে না, বরং মোংলা অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন গতি আনবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত