প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ । রাজনীতি ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে ভারতকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, সীমান্তে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ করতে হলে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
শুক্রবার (২৬ জুন) মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম সীমান্ত এলাকায় সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর গুলিতে নিহত মুজিব আলীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। পরে তিনি নিহতের কবর জিয়ারত করেন এবং সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে বক্তব্য দেন।
এ সময় এনসিপির আরেক মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সীমান্তে যারা হত্যার শিকার হচ্ছেন, তাদের পরিচয় একটাই—তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কোনো ব্যক্তির ধর্ম, পেশা বা সামাজিক পরিচয় নয়, বরং নাগরিক হিসেবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি হওয়ার কারণেই সীমান্তে মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধ করতে হলে শুধু প্রতিবাদ বা কূটনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট নয়। এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সীমান্তে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে সীমান্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ দেশের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অনেক সীমান্ত এলাকায় এখনো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং স্থানীয় মানুষ সংকটের মুখে পড়ে।
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে দেশের স্বার্থ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না।
তিনি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান। আধুনিক অস্ত্র, উন্নত টহল ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এনসিপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সীমান্তে নিহত নাগরিকদের পরিবারকে সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে সারজিস আলম বলেন, সীমান্তে অন্যায় ও হত্যাকাণ্ড ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। সীমান্ত এলাকার জনগণকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সীমান্ত শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
সারজিস আলম বলেন, সীমান্তে পুশইন বা যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের প্রতিটি নাগরিককে দেশের নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, যদি তারা জনগণের স্বার্থ ও দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ভারতের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে কথা বলতে পারে, তাহলে এনসিপি ও দেশের ছাত্র-জনতা তাদের পাশে থাকবে।
এর আগে এনসিপির নেতারা কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে নিহত মুজিব আলীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা সীমান্তবর্তী চাতলা বাজার এলাকায় একটি পথসভায় অংশ নেন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেন।
উল্লেখ্য, গত ১২ জুন ভারতের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে প্রবেশের সময় বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক মো. মুজিব আলী নিহত হন বলে জানা যায়। নিহত মুজিব আলী কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। বিজিবি ৪৬ ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্ত হত্যার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্তে প্রাণহানি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোপুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল বাহিনীগুলোর তৎপরতা নয়, দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, মানবাধিকার রক্ষা এবং সীমান্তবাসীর উন্নয়ন একসঙ্গে প্রয়োজন।