প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা নিয়ে কাজ না করেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন দেশি-বিদেশি শতাধিক ঠিকাদার। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় সরকার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অন্তত ৬০টি চলমান প্রকল্প। প্রকল্পে ব্যয় অনুপাতে কাজের অগ্রগতি তো নেই-ই, বরং টেন্ডার জিতে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে যেভাবে ঠিকাদাররা উধাও হয়ে গেছেন, তাতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি যেন এক ভয়ানক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে এ অপচয়ের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
এই ভয়াবহ অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’ ও ‘আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেন মহাসড়ক প্রকল্প’। প্রথমটি কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়ায় সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ৮০০ কোটি টাকার কাজ ছেড়ে পালিয়েছেন ১৬ জন ঠিকাদার, যার ফলে প্রকল্পের একটি বড় অংশ পুরোপুরি থমকে গেছে।
আরেকটি বড়সড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘আশুগঞ্জ-আখাউড়া মহাসড়ক’ প্রকল্পে। পাঁচ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার প্রকল্পটি গত এক বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ পড়ে আছে। এফকনস প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আর তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ১০টি প্রকল্পে আত্মসাৎ হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৪টি প্রকল্পে ৩২৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, সড়ক ও জনপথ বিভাগে ৬৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা, এবং রেলপথ বিভাগে ১৬১ কোটি ২১ লাখ টাকা। কোথাও কোনো কাজ হয়নি, কোথাও সামান্য কাজ শুরুর পরেই ঠিকাদারেরা বেপাত্তা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে এই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ ঠিকাদার ছিলেন আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ফাঁকি দিয়েছে, আর দেশি ঠিকাদারদের ক্ষেত্রে আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে বারবার।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পূর্ববর্তী সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে পেশাদার প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সংযোগে যুক্ত ঠিকাদারদের অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “সাবেক সরকার প্রকল্প বণ্টনের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল। তারা প্রকল্প সংগ্রহ করে পরে তা বিক্রি করেছে টাকার বিনিময়ে।”
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “অনেক প্রকল্পের ঠিকাদারদের আর পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চললেও প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থেমে গেছে।”
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেমন সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার, রেলপথ ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোয় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্ব করছিল। এদের অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ে সুবিধা পেয়েছেন।
বর্তমানে দেশে চলমান প্রকল্পের মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০টি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে বড় পরিসরের অনিয়ম ধরা পড়েছে। চারটি মন্ত্রণালয়ের ৬০টিরও বেশি প্রকল্পে কাজ না করেই দেড় হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশিত সেবাও আটকে গেছে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এখন দ্রুত উদ্যোগ নিচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে বন্ধ থাকা প্রকল্পগুলো চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এরইমধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি বিভাগ দেশের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের নাম পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কার্যদিবস।
আইএমইডির সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “নিয়মিত পরিদর্শনে এই অনিয়ম ধরা পড়েছে। চারটি মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ঠিকাদাররা কাজ ফেলে পালিয়ে গেছেন—এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি প্রকল্পের তথ্যও সংগ্রহ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।”
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান, “প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, সব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে। সে লক্ষ্যে এখন সারা দেশে প্রকল্প পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, টেন্ডার ব্যবস্থায় যতক্ষণ না পর্যন্ত পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে, ততদিন উন্নয়ন প্রকল্পে এই ধরণের অর্থ লোপাট ও দেউলিয়াত্ব থামবে না। নতুন করে টেন্ডার ডাকলেও প্রকল্পগুলোর কাজ বাস্তবে কখন শুরু হবে এবং তা আদৌ শেষ হবে কি না—এটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।এই বাস্তবতায়, শুধু ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং পুরো উন্নয়ন কাঠামোর জবাবদিহিহীনতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এখন রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন