প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগ ও গুজবের মধ্যে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী অন্তত দুই মাস দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি হবে না। পর্যাপ্ত মজুত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই সময়ের মধ্যে সংকটের আশঙ্কা নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বিস্তারিতভাবে দেশের বর্তমান জ্বালানি মজুতের চিত্র তুলে ধরে জানান, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন ডিজেল, ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন পেট্রল এবং ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে। এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে অন্তত দুই মাস নির্বিঘ্নে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
জ্বালানি বিভাগের এই আশ্বাস এমন এক সময়ে এলো, যখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রল পাম্পে অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কায় আগাম তেল মজুতের চেষ্টা করছেন। তবে এই পরিস্থিতিকে ‘প্যানিক বায়িং’ হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মনির হোসেন চৌধুরী। তার মতে, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, বরং গুজবের কারণেই এই অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ে যেসব পরিমাণ জ্বালানি পেট্রল পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছিল, চলতি বছরও ঠিক একই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনোভাবেই সরবরাহ কমানো হয়নি। ফলে বাস্তবিক অর্থে সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে ঢাকার বাইরে এই ধরনের অতিরিক্ত ভিড় বা চাপ দেখা যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি মূল্য নিয়েও কথা বলেন এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে প্রতি মাসেই জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়। এপ্রিল মাসেও সেই নিয়ম অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা হয়েছে। আগামী মাসে দাম বাড়বে না কমবে—তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর।
দেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দেন তিনি। মনির হোসেন চৌধুরী জানান, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। তালিকা অনুযায়ী এবং চাহিদা বিবেচনায় জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ১৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে কিছুটা জটিলতার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। মার্চ ও এপ্রিল মাসে সরকার ক্রুড অয়েল আমদানি করতে পারেনি বলে জানান তিনি। তবে বিকল্প ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, এপ্রিলের শেষ দিকে বা মে মাসের শুরুতে সৌদি আরব থেকে ভিন্ন রুটে ক্রুড অয়েল দেশে আসবে। এই চালান পৌঁছালে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা সম্পর্কেও তথ্য দেন তিনি। বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি পরিশোধন করতে পারে এই প্রতিষ্ঠান, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পূরণ করে। বাকি জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি খাতে এই ধরনের আশ্বাস জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নানা বাধার কারণে অনেক দেশেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আপাতত স্থিতিশীলতা বজায় থাকাটা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই আশ্বাস স্বল্পমেয়াদে স্বস্তির হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা একটাই—গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি ব্যবহার করা এবং অপ্রয়োজনীয় মজুত থেকে বিরত থাকা।