প্রশান্ত মহাসাগরে ভূমিকম্পের জোয়ার: ইকুয়েডরে সুনামির সম্ভাবনা, সতর্ক বিশ্ব উপকূল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৭ বার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কামচাটকা উপদ্বীপে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্প নতুন করে নাড়া দিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোকে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় দেশ ইকুয়েডর এখন সুনামির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র (Pacific Tsunami Warning Center)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইকুয়েডরের উপকূলে তিন মিটার বা ১০ ফুট উচ্চতার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (USGS) তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটি ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ছিল, যদিও প্রথমে এর মাত্রা ৮ দশমিক ৭ হিসেবে রেকর্ড করা হয়। এটি কামচাটকার পেত্রোপাভলোভস্ক-কামচাতস্কি শহর থেকে প্রায় ১২৬ কিলোমিটার দূরে এবং ভূ-পৃষ্ঠের ১৮ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়। এত গভীরতা সত্ত্বেও ভূমিকম্পটি এতটাই তীব্র ছিল যে, তা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা কামচাটকা উপদ্বীপে প্রায় সময় ভূমিকম্প হলেও এবারের তীব্রতা ও এর পরিণাম বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ইতোমধ্যে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক আঞ্চলিক মন্ত্রী সের্গেই লেবেদেভ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের ফলে কামচাটকা উপকূলে ৩ থেকে ৪ মিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ দেখা গেছে। এসব ঢেউ স্থানীয় জনজীবনে কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, তবে এখনও পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, ভূমিকম্পের সৃষ্ট সামুদ্রিক তরঙ্গ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অনেক দূরের উপকূলেও আছড়ে পড়তে পারে। সে কারণেই প্যাসিফিক রিমভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর ও তার আশেপাশের গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ‘প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ’ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের উপকূলীয় এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন সেখানকার পর্যটন কার্যক্রম সীমিত করেছে।

জাপানের হোক্কাইডো থেকে শুরু করে কিউশু পর্যন্ত পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন ও ওয়াশিংটন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকাতেও জনগণকে সমুদ্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পটি রিং অব ফায়ার নামে পরিচিত ভূগর্ভীয় অতিকায় একটি বৃত্তাকার অঞ্চলের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। এই অঞ্চলটিতে পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণ হয়ে থাকে। ফলে এটি শুধু এক দেশ বা অঞ্চলের জন্য নয়—সারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলরেখার জন্য হুমকিস্বরূপ।

ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (Caltech) ভূতত্ত্ববিদ ড. আলেক্স ম্যালকম এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “ভূমিকম্পের স্থল কেন্দ্র থেকে সুনামির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৭০০-৮০০ কিলোমিটার। এর অর্থ হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সুনামি ঢেউ একটি মহাদেশ থেকে আরেকটিতে পৌঁছাতে সক্ষম। এ কারণেই ইকুয়েডর, পেরু, চিলি এবং কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”

এদিকে ইকুয়েডরের আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, দেশের পশ্চিম উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যেতে বলা হয়েছে। জেলেদের গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং উপকূলবর্তী শহরগুলোতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঢেউয়ের দিক ও গতি। যদি ভূমিকম্প-উত্তর সৃষ্ট তরঙ্গ ইকুয়েডরের উপকূলে আছড়ে পড়ে, তবে এটি হবে ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামির পর অন্যতম বড় ধাক্কা। সে সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ঘটনার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং বিভিন্ন উপকূলবর্তী দেশগুলোকে আগাম সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ইকুয়েডরের পরিস্থিতি যেকোনো সময় গুরুতর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তবে একই সঙ্গে আশাবাদী অনেকেই—বিশ্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত, সচেতন এবং প্রযুক্তিগতভাবে সজ্জিত।

তবু, প্রকৃতির তাণ্ডবের পূর্বাভাস দিলেও মানবিক প্রস্তুতি ছাড়া তা রোধ সম্ভব নয়। ইকুয়েডরসহ সুনামি সতর্ক দেশগুলোর মানুষ এখন প্রহর গুনছে—ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট ঢেউ যেন শান্ত থাকে, এবং প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতি যেন রোধ করা সম্ভব হয়।

এখন দেখার বিষয়, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও জনসচেতনতাই কি পারবে আরও একবার ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’কে মানবিক ট্র্যাজেডি হওয়া থেকে রুখে দিতে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত