মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে সুদহার কমানোর পথে বাংলাদেশ ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৯ বার

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের আর্থিক খাত ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক সম্ভাবনাময় বার্তা দিয়ে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ঋণের সুদহার কমানোর পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চলমান সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে শিগগিরই সুদহার হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গভর্নর জানান, “আমরা ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। লক্ষ্য হচ্ছে এটিকে তিন শতাংশের ঘরে নিয়ে আসা। যদি মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামে, তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”

আজ বৃহস্পতিবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসবে বলে জানান তিনি।

ড. মনসুর বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গেলে দুই দিক থেকে নীতিমালা গ্রহণ করতে হয় – একটি সরবরাহের দিক থেকে, আরেকটি চাহিদার দিক থেকে। আমরা শুরুতেই চাহিদার ওপর নিয়ন্ত্রণ এনেছি। সুদহার বাড়িয়ে ব্যাংক ঋণ ও তারল্য সংকুচিত করেছি, যার মাধ্যমে ভোগ ও বিনিয়োগ চাহিদা কিছুটা দমন করা গেছে।” পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, সরকার নিজস্ব বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও সংকোচন চালিয়েছে, যাতে সামষ্টিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক সরব ছিল। গভর্নর জানান, গত অর্থবছরে যখন দেশে ডলার সংকট চরমে পৌঁছেছিল, তখনও এলএনজি, সার ও বিদ্যুতের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটেনি। তিনি বলেন, “যাদের হাতে বেশি ডলার ছিল, তাদের কাছ থেকে নিয়ে আমরা অন্যদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছি।” ফলে আমদানি খাতে ভারসাম্য রক্ষা এবং বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার সফল হয়েছে।

ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যতিক্রমী কৌশল নেয়। শুরুতে ব্যাংকগুলোকে ১২২ টাকা রেট ধরে ডলার লেনদেনের নির্দেশ দেওয়া হলেও পরে এই রেট বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ডলার ছেড়ে দিলে রেট বেড়ে ১৬০ বা ১৭০ টাকা হয়ে যাবে। কিন্তু গভর্নরের দাবি, “আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এখন বাজারেই ডলার রেট স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, যা মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”

তবে তিনি সরাসরি বলেন, “মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বলে আমি সন্তুষ্ট নই। আমাদের টার্গেট হচ্ছে এটিকে তিন শতাংশে নামিয়ে আনা।” তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, এমনকি চীনও তাদের মূল্যস্ফীতি তিন শতাংশের ঘরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। “তারা পারলে আমরা কেন পারব না? আমাদেরও তা সম্ভব,” বলেন গভর্নর।

সুদহার কমানোর সময়সীমা নির্ধারণে তিনি বলেন, বর্তমানে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশ। এর নিচে মূল্যস্ফীতি নেমে এলেই ব্যাংকের সুদহারও হ্রাস করা হবে। এক্ষেত্রে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার গত কয়েক মাসে স্বাভাবিকভাবেই ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি শুধু ‘ওভার নাইট রেট’-এ হস্তক্ষেপ করেছে। এটি আগে সাড়ে ৮ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমিয়ে মুনাফা করার সুযোগ না দিয়ে, বাস্তব খাতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত অর্থনীতিকে উত্পাদনমুখী বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং পুঁজির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সার্বিকভাবে বলা যায়, দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কৌশল গ্রহণ করছে, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দৃঢ়তা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত