প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্ব রাজনীতির এক সংবেদনশীল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। কৌশলগতভাবে ‘বন্ধু’ হলেও ভারতকে এখনো শতভাগ মিত্র হিসেবে মানতে নারাজ ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ভারতের অনেক নীতি ও কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিরক্তি’ বাড়ছে এবং এই সম্পর্ক এখনো পূর্ণতা পায়নি।
বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, “আমরা ভারতকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। তারা আমাদের বন্ধু, কিন্তু এখনো শতভাগ মিত্র নয়।” তার এ বক্তব্যের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মাঝে বিশ্বাস ও পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে অস্থিরতা বাড়ছে।
রুবিওর বক্তব্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ ছিল—রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অপরিবর্তিত জ্বালানি বাণিজ্য। তার ভাষায়, “ভারত একটি বড় দেশ। তাদের তেল, গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির চাহিদা বিশাল। এই চাহিদা পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তারা যেমন চাইলেই যেতে পারে, তেমন সক্ষমতাও তাদের আছে। কিন্তু তারা তা করছে না। বরং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই তেল আবার প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চ দামে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছে।”
মার্কিন প্রশাসনের একাংশের মতে, ভারতের এই কৌশলিক জ্বালানি নীতি শুধু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নীতির ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না, বরং পশ্চিমা জোটের মধ্যে ঐক্যতানেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। রাশিয়ার উপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে কার্যত পাশ কাটিয়ে ভারত যেভাবে লাভবান হচ্ছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অস্বস্তিকর’ বলেই মনে করছেন রুবিও।
এছাড়াও, এই সাক্ষাৎকারের ঠিক একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেছেন। এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন বাণিজ্য উত্তেজনার সূচনা করেছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভারতের জ্বালানি ও বাণিজ্য নীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ।
গত এক দশকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা, তথ্য প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, এবং চীনা আধিপত্য মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করলেও জ্বালানি ও বাণিজ্যখাতে এই সম্পর্ক প্রায়শই দ্বিধান্বিত থেকেছে। বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রতি ভারতের নীতিনির্ধারণ মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত যেন তাদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং পশ্চিমা নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করে। কিন্তু ভারত নিজের ভূ-অর্থনৈতিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করছে, যা কখনো কখনো পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে।
রুবিওর বক্তব্যের মাধ্যমে এই বাস্তবতা আরও একবার স্পষ্ট হলো—যেখানে মিত্রতা কাগজে থাকলেও বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রমে দ্বিধা এখনো প্রকট। এমন অবস্থায় আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে পারস্পরিক সমঝোতা, স্বার্থের ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তনশীল মেরুকরণের ওপর।
বিশ্ব রাজনীতির এই জটিল সময়ে দুটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার ফাঁক আরও প্রশস্ত হয় কি না, নাকি বাস্তবতা মেনে উভয় পক্ষই নতুন সমীকরণে পৌঁছায়—তা সময়ই বলে দেবে। তবে বর্তমানে যে উত্তেজনা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।









