রাশিয়া-ভারত জ্বালানি বাণিজ্যে উত্তাপ: ট্রাম্পের হুমকি, নয়াদিল্লির কড়া জবাব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ৪৫ বার

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য নিয়ে ভারতকে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে হাজারো মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় ভারত ‘অবিচল’, এবং সে কারণেই তিনি দিল্লির ওপর “গুরুত্বপূর্ণ হারে” শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছেন।

ভারত অবশ্য এই হুমকিকে ‘অযৌক্তিক ও অহেতুক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সোয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, “একটি দেশের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ভারতের অধিকার।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতকে রাশিয়ার গ্যাস আমদানিতে উৎসাহ দিয়েছিল।

জয়সোয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে, ভারতকে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছিল। কারণ ঐ সময় ভারতের ঐতিহ্যবাহী সরবরাহকারীরা তাদের রপ্তানি ইউরোপমুখী করে দেয়। ফলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি এমন এক সময় এলো যখন কয়েকদিন আগেই তিনি ভারতের কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে নতুন করে শুল্ক কতটা বাড়ানো হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি। তবু ট্রাম্পের পোস্টে ভারত নিয়ে একাধিক অভিযোগ এবং হুমকি উঠে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন করে জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভারতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যখন এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপের হুমকি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে আনুমানিক সাড়ে তিনশ কোটি ডলারের পণ্যবিনিময় হয়েছে। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই শতভাগ কঠোর নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান আসন্ন নির্বাচনের প্রচার কৌশলেরই অংশ। ভোটারদের সামনে কঠোর নেতৃত্বের চিত্র তুলে ধরতে তিনি বাণিজ্যিক হুমকিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে এই হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বার্তা স্পষ্ট করে দেয়— যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ রক্ষায় ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও চাপে ফেলতে দ্বিধা করছে না।

ভারতের প্রতিক্রিয়ায় এই বার্তাও ছিল যে, বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে নয়, সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জয়সোয়াল বলেন, “যেকোনো বড় অর্থনীতির মতো, ভারতও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভারতকে লক্ষ্যবস্তু করা অযৌক্তিক।”

ট্রাম্প যদিও ভারতকে এখনো “বন্ধু” বলে উল্লেখ করেন, কিন্তু তার একাধিক মন্তব্য ভারতের বাণিজ্য নীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর আগে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক হার অনেক বেশি এবং এ বিষয়ে সমতা আনার জন্য ভারতকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এই পুরো ঘটনায় দুই দেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক বাণিজ্য সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত শান্ত ও দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখছেন, এবং এমন সংকটে কৌশলী কূটনৈতিক ভারসাম্যই রক্ষা করছে নয়াদিল্লির ভাবমূর্তি। এর ফলে স্পষ্ট যে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারত এখন আর কেবল একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়— বরং একটি কৌশলগত শক্তি, যা তার জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কোনো আপস করতে রাজি নয়।

এখন দেখার বিষয়, এই উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদি কোনো বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে গড়ায় কি না, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র এই হুমকি বাস্তবায়নে কতটা অগ্রসর হয়। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত