পারমাণবিক বিভীষিকার ৮০ বছর: হিরোশিমায় স্মরণ, শোক আর শান্তির আহ্বান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ৪৪ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আজ থেকে ঠিক ৮০ বছর আগে, মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহতম দিন হিসেবে চিহ্নিত হয় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। সেই সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে জাপানের হিরোশিমা শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘লিটল বয়’ নামের একটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে চালানো এই হামলায় মুহূর্তেই প্রাণ হারান প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ। পরবর্তী সময়ে মৃত্যু ও রোগব্যাধির সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় দুই লাখেরও বেশি। এই ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে যাওয়া অনেককে, আর বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রিয় মানুষদের মনে গেঁথে রয়েছে এক চরম শিক্ষা—মানবজাতির হাতে নিজেকে ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকলেও, তার প্রয়োগ যেন আর কখনও না ঘটে।

এই বেদনার্ত অধ্যায়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আজ হিরোশিমায় হাজারো মানুষ একত্র হন ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’-এ। প্রার্থনায় নত হয় তাদের মাথা। মোমবাতির আলোয় মুখোমুখি হয় ইতিহাসের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা এবং বিশ্বের নানা দেশের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। একাধারে এটি ছিল স্মরণ, শ্রদ্ধা ও একটি নিরস্ত্র পৃথিবীর প্রতি অঙ্গীকারের মুহূর্ত।

হিরোশিমার মেয়র কাজুমি মাতসুই এই উপলক্ষে একটি আবেগঘন ভাষণে বলেন, “জাপানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা পারমাণবিক বোমার প্রত্যক্ষ আঘাত সহ্য করেছে। সেই বিভীষিকার শিক্ষা আজও আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।” তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, যেন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং মানবতার পক্ষে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মেয়র মাতসুই আরও বলেন, “জাপান সরকার এমন একটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা প্রকৃত এবং স্থায়ী শান্তির আকাঙ্ক্ষা করে।”

হিরোশিমা ও নাগাসাকি—এই দুই শহরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৫ সালে যেসব ভয়াবহতা সংঘটিত হয়েছিল, তার ক্ষত আজও মিলিয়ে যায়নি। হিরোশিমার বাসিন্দা শিঙ্গো নাইতো, যিনি হামলার সময় মাত্র ছয় বছর বয়সী ছিলেন, সেদিনের কথা স্মরণ করে বলেন, “বিস্ফোরণে আমার বাবা মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিলেন, তার দৃষ্টিশক্তি চলে গিয়েছিল। শরীর থেকে চামড়া ঝুলছিল। তিনি আমার হাতও ধরতে পারছিলেন না।” শিঙ্গোর বাবা এবং দুই ছোট ভাইবোন সেদিনই প্রাণ হারান।

যুক্তরাষ্ট্র যখন হিরোশিমায় পারমাণবিক হামলা চালায়, এর কয়েক দিনের মধ্যেই নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। এই দুটি হামলায় একসঙ্গে নিহত হন প্রায় দুই লাখ মানুষ। অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে নানা অসুস্থতায় ভুগেছেন আজীবন। এমনকি, বহু শিশু জন্মগ্রহণ করেছে জেনেটিক বিকৃতি নিয়ে।

এই পারমাণবিক আক্রমণের ঠিক পরপরই জাপান আত্মসমর্পণ করে, যার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও, তার ক্ষত শুকায়নি। বরং এই হামলা পৃথিবীর সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ছায়া ফেলে গেছে, যেটি আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আজকের দিনটি শুধু জাপানের জন্যই নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক উপলব্ধির দিন। এই উপলব্ধি যে পারমাণবিক অস্ত্র শুধুমাত্র ধ্বংসই আনতে পারে—নিরাপত্তা নয়। তবুও পরিহাস এই যে, ৮০ বছর পরেও বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ বেড়েই চলেছে। যুদ্ধ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত দেশগুলোর কাছে শান্তির বার্তা যেন আজও অনেকটাই উপেক্ষিত।

হিরোশিমা তাই কেবল একটি শহরের নাম নয়, এটি এক যুগান্তকারী ঘটনার প্রতীক। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, সভ্যতার অগ্রযাত্রার নাম করে যদি মানবতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়, তবে তা কোনো বিজয় নয়—বরং আত্মঘাতী পথচলা। বিশ্বনেতাদের সামনে আজও তাই এই প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়: পারমাণবিক ছায়া থেকে মুক্তি কি আদৌ সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেই পথের সূচনা হোক হিরোশিমার এই শোকদিবসে—যেখানে প্রত্যেকটি চোখ আজও প্রশ্ন করছে, ‘এমন আর কতবার?’

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত