প্রকাশ: ১৯ই জুন’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের ছায়ায় ঢাকা, কিন্তু পেছনের গল্পটা আরও গভীর, আরও জটিল। অনেকেই ভাবছেন, আমেরিকা যদি তাদের ভয়ঙ্কর GBU-57 MOP — যেটি ‘Bunker Buster’ নামে পরিচিত — দিয়ে ইরানের Fordow Uranium Enrichment Plant ধ্বংস করে দেয়, তাহলে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, ইরান কখনও তার কৌশল আগেভাগে খোলসা করে না। হয়তো এই মুহূর্তে তারা এমন একটি পাল্টা ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে, যার প্রভাব গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে, হয়তো আরও অনেক দূর।
একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার বালাকোটে একটি বিমান হামলা চালায়। দাবি করে, সেখানেই ছিল জৈশ-ই-মুহাম্মদের বড় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের এই হামলা মূলত একটি পরিত্যক্ত পাহাড়ি এলাকায় পড়েছিল, প্রাণহানির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, শুধুমাত্র আক্রমণ করলেই ‘বিজয়’ নিশ্চিত হয় না—বরং বিপরীতে কৌশলগত ব্যর্থতা বড় ধস নামাতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে যদি আমেরিকা ইরানের গোপন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে সেটা হবে বিশাল ঝুঁকির খেলা। কারণ, Fordow প্ল্যান্ট পাহাড়ের গভীরে গঠিত—শুধু একবার বোমা ফেলে ধ্বংস করে ফেলা সহজ নয়। বরং এই হামলার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ: ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মিলিটারি ঘাঁটিগুলোকে আক্রমণ করে বসতে পারে। তাদের হাতে তখন থাকবে একটাই যুক্তি—“যখন তুমি আমার ভূখণ্ডে হামলা করো, তখন প্রতিরোধ আমার অধিকার।”
সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা একজন ছোট্ট শিশুকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন। এই দৃশ্য যেন ইঙ্গিত করে, ইরান শুধু অস্ত্রের খেলা নয়, একটি সভ্যতা, একটি দর্শন, একটি অন্তর্নিহিত প্রতিরোধ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তারা ৪৬ বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি থেকেও নিজেদের টিকে রাখার কৌশল তৈরি করেছে। এই দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা তাদের প্রযুক্তিগতভাবে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে—যেটা হয়তো পশ্চিমারা এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আমেরিকার যেসব ‘Stealth Bomber’ দিয়ে এই হামলার পরিকল্পনা হচ্ছে, তার একেকটির উন্নয়ন ব্যয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। শুধু এই হিসাবই প্রমাণ করে এই যুদ্ধ কতটা উচ্চ ঝুঁকির, কতটা ব্যয়বহুল এবং কতটা অনিশ্চিত। মনে রাখতে হবে, যেমন এক সময় ফ্রান্সের রাফাল জেটের বিশ্বব্যাপী সুনাম ছিল, কিন্তু পাকিস্তান যখন চীনের তৈরি JF-17 দিয়ে সেটার বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখন রাফালকে আর কেউ খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখে না।
ঠিক তেমনভাবেই, যদি ইরান তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্টেলথ বোমার বহর ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়, তাহলে শুধু হামলার ফলাফলই নয়—পশ্চিমা আধিপত্যবাদী সামরিক শক্তির ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিও ভেঙে পড়বে।
এই মুহূর্তে ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত—তারা শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, প্ররোচনার জবাবে কৌশলগত চাল দিতে প্রস্তুত। হয়তো তাদের হাতে রয়েছে এমন কিছু প্রযুক্তি বা পরিকল্পনা, যা এখনো দুনিয়ার সামনে আসেনি। হয়তো যুদ্ধের শুরুতে যারা ভেবেছিল ইরান নত হবে, তারা শেষতক বুঝবে—এই অঞ্চল একতরফা ‘পাওয়ার শো’-র মঞ্চ নয়।
এই যুদ্ধ কেবল বোমার নয়—এটা বিবেক, বৈধতা ও নৈতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে লড়াই। যেটা শেষ পর্যন্ত বদলে দিতে পারে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার ধারাভাষ্য।








