সাত দলের ঐক্য নিয়ে হেফাজতে মতপার্থক্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
সাত দলের ঐক্য নিয়ে হেফাজতে মতপার্থক্য

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কওমি ধারার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। তবে উদ্যোগটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। জোটের শরিকরা অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, ঐক্যটি আদর্শিক নাকি রাজনৈতিক চরিত্রের হবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আলোচনা এগোলেও এখনই নতুন জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছে না।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দলের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হলেও সব বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি। ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সাত দলের প্রতিটি থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি এবং হেফাজতের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা রয়েছেন। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। কেউ বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সম্পর্ক রেখেছে, কেউ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে রয়েছে, আবার কেউ আলাদাভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এই ভিন্ন অবস্থানই নতুন ঐক্যের কাঠামো নির্ধারণে অন্যতম জটিলতা তৈরি করেছে।

হেফাজতের উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উঠে এসেছে, নতুন ঐক্যে যুক্ত কোনো দল অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি পক্ষ মনে করছে, সাত দলের ঐক্য যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তাহলে শরিক দলগুলোর অন্য কোনো জোটে থাকা নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাদের দৃষ্টিতে আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হলে এর শরিকদের অবস্থানও অভিন্ন হওয়া দরকার।

অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির পক্ষ থেকে এমন শর্ত নিয়ে আপত্তির কথা উঠে এসেছে। তাদের প্রস্তাবের মূল বিষয় হলো, সাত দলের মধ্যে আদর্শিক ঐক্য গড়ে উঠলেও প্রত্যেক দল তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে স্বাধীন থাকবে। অর্থাৎ কোনো একটি দলের সঙ্গে জোটে থাকা বা নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়টি ঐক্যের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারণ না করার পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অবস্থানও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলটি বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা কয়েকটি দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গেও সম্পর্ক রেখেছে। ফলে একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত—দুই বৃহৎ রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে সাত দলকে নিয়ে পৃথক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের বক্তব্য অনুযায়ী, সাত দলীয় ঐক্য হলে কোনো শরিক অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে থাকতে পারবে না। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অন্য শরিকরা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে জমিয়তও বিএনপির সঙ্গে থাকা নিয়ে নতুন করে ভাববে। দলটির মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দীও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা বিষয়টিকে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন; এরপরই শরিকদের অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

ঐক্যের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করছে, সাত দলের সম্ভাব্য ঐক্য কেবল আদর্শিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামপন্থি দলগুলোর শক্তিকে সুসংহত করে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে আবার জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টিকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। দলটির মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, ঐক্য যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে শরিক দলগুলোর জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে থাকা প্রয়োজন।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে সাত দলের অবস্থানও অভিন্ন নয়। হেফাজতের নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান না থাকার কথা আলোচনায় এসেছে। জমিয়তের অবস্থান বিএনপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস সনদ ও গণভোটের বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এই মতপার্থক্যের মধ্যেই ঐক্যের রূপরেখা তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতটি দলের পক্ষ থেকে পৃথক প্রস্তাব সংগ্রহের পর সেগুলো সমন্বয় করে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করা হয়। ফটিকছড়ির বৈঠকে সেই খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সব বিষয়ে একমত না হওয়ায় বিষয়গুলো আরও পর্যালোচনার জন্য লিয়াজোঁ কমিটির ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠক ২২ অক্টোবর ঢাকায় হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দলগুলোর মতপার্থক্যের বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনা করে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে। সাত দলই ঐক্যের বিষয়ে ইতিবাচক—এমন বক্তব্য সংশ্লিষ্ট নেতারা দিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত রাজনৈতিক কাঠামো, নেতৃত্ব ও জোটগত অবস্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি।

নেতৃত্বের প্রশ্নটিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন জোট হলে আহ্বায়ক বা প্রধান নেতা কে হবেন, সদস্য সচিব বা সমন্বয়কারী কীভাবে নির্বাচিত হবেন এবং ভবিষ্যতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়েও এখনো পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বিভিন্ন দলের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকায় নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে সমঝোতা করাও জোট গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য নতুন জোটের উদ্যোগকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্নভাবে দেখছে। দলটির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হেফাজতের উদ্যোগের সঙ্গে বৃহত্তর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক জোটের বর্তমান কাঠামোর সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রয়েছে। এসব বক্তব্য অবশ্য জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

হেফাজতের পক্ষ থেকে অবশ্য উদ্যোগটির উদ্দেশ্যকে বিভক্ত ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেছেন, বিভক্ত ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরির চেষ্টা চলছে। সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদীও জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটি অভিন্ন ভিত্তির ওপর দলগুলোকে কাছাকাছি আনার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ, সাংগঠনিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। দেওবন্দি ধারার দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের মতাদর্শগত পার্থক্য দীর্ঘদিনের। একই সঙ্গে নির্বাচন, জোট, আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রশ্নেও দলগুলোর মধ্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দল কখনো পরস্পরের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় গেছে, আবার বিভিন্ন ইস্যুতে পৃথক অবস্থানও নিয়েছে।

এই বাস্তবতায় হেফাজতের উদ্যোগে সাত দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার প্রচেষ্টা সফল করতে হলে শুধু আদর্শিক নৈকট্য নয়, রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে কোনো দল একই সময়ে নতুন ঐক্য এবং বিএনপি বা জামায়াতের মতো অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে কি না, তা নির্ধারণ না হলে নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত আলোচনার ফল হিসেবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাত দলের মধ্যে ঐক্যের বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু ঐক্যের কাঠামো ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমঝোতা এখনও অসম্পূর্ণ। ২২ অক্টোবরের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এসব মতপার্থক্যের কতটা সমাধান হয়, সেটিই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রতিটি দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় আসতে পারে।

হেফাজতের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জোটে রূপ নেয় কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে কওমি ধারার সাত দলের মধ্যে সমন্বয়ের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতিতে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আগামী দিনের বৈঠকগুলোতে জোটের রাজনৈতিক চরিত্র, অন্য দলের সঙ্গে সম্পর্ক, নেতৃত্ব কাঠামো এবং অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে, তার ওপরই উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ রূপ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত