প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজও আদালতে জমা পড়েনি। দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখেও তদন্ত প্রতিবেদন না আসায় আদালত আগামী ৫ নভেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১৩০ বার পেছাল।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে আদালত নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
একটি হত্যা মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া শুধু আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বজনদের অনিশ্চয়তা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির স্বজনদের জন্য ২০১২ সালের সেই রাতের পর কেটে গেছে একের পর এক বছর। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনো স্পষ্ট হয়নি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা দুজনই গণমাধ্যমে কর্মরত ছিলেন। সাগর সরওয়ার মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর স্ত্রী মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। নিজেদের কর্মজীবনে দুজনই সাংবাদিকতা পেশায় সক্রিয় ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। শুরুতে থানা-পুলিশ মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পালন করে। পরে তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে। একপর্যায়ে মামলার তদন্তের দায়িত্ব যায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্তের দায়িত্ব পরিবর্তন হলেও মামলার রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন রয়ে যায়।
ঘটনার এক যুগ পর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে র্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় পিবিআই। এরপর নতুন করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পায় সংস্থাটি। দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলার আলামত, নথিপত্র এবং পূর্ববর্তী তদন্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে পিবিআই।
তবে পিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। একের পর এক নির্ধারিত তারিখ পার হয়েছে। প্রতিবারই নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ আজকের তারিখেও প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় আদালত আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।
সাগর-রুনি হত্যা মামলা বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের কাছেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ঘটনা। একই পেশার দুই সাংবাদিকের নিজ বাসায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হত্যার কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী ধরনের উদ্দেশ্য ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে শুরু থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়। সময় যত গড়িয়েছে, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা সেই প্রশ্নগুলোকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। মামলার তদন্তে একাধিক সংস্থার পরিবর্তন, পুরোনো আলামত ও তথ্য পুনর্মূল্যায়ন এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বারবার পিছিয়ে যাওয়ার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। এর ফলে নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবার ও স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হয়েছে।
সাগর ও রুনির হত্যার পর তাঁদের পরিবার যে শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কেবল একটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে এবং আইনের আওতায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি দেখতে চায়। সাগর-রুনি মামলার ক্ষেত্রেও সেই প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে বহমান।
অন্যদিকে, তদন্তের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এত বছর পর একটি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থাকে আগের তদন্তের নথি, সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য নতুন করে পর্যালোচনা করতে হয়। সময়ের সঙ্গে সাক্ষীদের স্মৃতি, তথ্যের প্রাপ্যতা এবং বিভিন্ন প্রমাণের অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ার বিষয়টিও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে তদন্তের প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তবে দীর্ঘ তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সত্য উদ্ঘাটনের প্রত্যাশাও রয়েছে। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পর মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই প্রতিবেদন দাখিলের প্রতিটি নতুন তারিখ ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য যেমন প্রত্যাশার বিষয়, তেমনি প্রতিবেদন আবার পিছিয়ে গেলে অপেক্ষাও দীর্ঘ হয়।
সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখে প্রতিবেদন জমা না পড়ায় এখন সবার নজর আগামী ৫ নভেম্বরের দিকে। ওই দিন পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারে কি না, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আদালতে কী তথ্য দেওয়া হয়, সেটিও মামলার পরবর্তী গতিপথের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর ১৪ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁদের সহকর্মীদের অনেকেই পেশাগত জীবনে এগিয়ে গেছেন, গণমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তি ও তদন্তের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তাঁদের পরিবারের কাছে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির সেই রাতের প্রশ্ন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১৩০ বার পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই দীর্ঘ অপেক্ষাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন প্রত্যাশা, তদন্তের সব দিক যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় মামলাটির তদন্ত শেষ করা হবে এবং আদালতে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তা জানতে আগামী ৫ নভেম্বরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।