নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরে পিটুপি লেনদেন চালু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরে পিটুপি লেনদেন চালু

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও আন্তঃব্যবহারযোগ্য করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বা পিটুপি (P2P) অর্থ স্থানান্তর সুবিধা চালু হতে যাচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এ সুবিধা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে একজন ব্যক্তি নিজের ব্যবহৃত ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির বাংলা কিউআর স্ক্যান করে সরাসরি অর্থ পাঠাতে পারবেন। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কিউআর কোডের ছবি অ্যাপে আপলোড করেও অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ থাকবে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বাংলা কিউআরের বর্তমান ব্যবহার, লেনদেনের প্রবৃদ্ধি, মার্চেন্টদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাংলা কিউআর চালুর মূল লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমন্বিত ও আন্তঃব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা। এতদিন বাংলা কিউআর মূলত দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য মার্চেন্টের কাছ থেকে পণ্যের মূল্য পরিশোধে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। নতুন পিটুপি সুবিধা চালু হলে এর ব্যবহার ব্যক্তিগত অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকেরা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে দেশজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ মার্চেন্টের বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন। ফলে নগদ অর্থ বহনের প্রয়োজন কমানোর পাশাপাশি ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর লেনদেনে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত জুন মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলা কিউআর পেমেন্ট সম্পন্ন হতো। তখন এসব লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ছিল দিনে ২৮ কোটির বেশি টাকা। বর্তমানে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন হচ্ছে এবং এর অর্থমূল্য প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি লেনদেনের আর্থিক মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ১ জুলাই থেকে ৯০ দিনের ব্যবধানে বাংলা কিউআর লেনদেনের সংখ্যা গড়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং লেনদেনের অর্থমূল্য প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বাড়াতে গত ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআরের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহককে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি অভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মার্চেন্টদের জন্য বাংলা কিউআর পেমেন্টকে আরও সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করতে আগামী ১ অক্টোবর থেকে বেশ কিছু পরিবর্তন কার্যকর হবে। ওই দিন থেকে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্টের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের হিসাবে জমা হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না।

একই সঙ্গে বাংলা কিউআর পেমেন্টে অর্থগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম এক শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট হার বাতিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্ট পর্যায়ে লেনদেনের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে মার্চেন্টদের বিনা চার্জে অথবা তুলনামূলক কম খরচে বাংলা কিউআর পেমেন্ট সেবা দিতে পারবে।

ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া দুই হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি বাংলা কিউআর লেনদেনে অর্থগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ এবং অর্থপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারণে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের আস্থা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কোনো বাংলা কিউআর লেনদেন ব্যর্থ হলে দ্রুততম সময়ে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লেনদেন ব্যর্থতার কারণে গ্রাহকের অর্থ আটকে থাকা কিংবা অনিশ্চয়তায় পড়ার ঝুঁকি কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

লেনদেন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে সেটি দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। এর ফলে বাংলা কিউআর ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহক, মার্চেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা সম্ভব হবে।

বাংলা কিউআরের পিটুপি সুবিধা চালু হলে দৈনন্দিন ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বাড়তে পারে। পরিবারের সদস্যকে অর্থ পাঠানো, পরিচিত কাউকে টাকা দেওয়া কিংবা ছোটখাটো ব্যক্তিগত পাওনা পরিশোধের মতো কাজে কিউআরভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর নতুন একটি বিকল্প তৈরি করবে। বিশেষ করে যেসব মানুষ নিয়মিত ব্যাংক অ্যাপ বা মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করেন, তাদের জন্য আন্তঃব্যবহারযোগ্য পিটুপি লেনদেন ব্যক্তিগত অর্থ স্থানান্তরকে আরও সহজ করতে পারে।

তবে নতুন এই সুবিধার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, গ্রাহক সচেতনতা এবং লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। কিউআর কোড ব্যবহারের সময় ভুল ব্যক্তি বা ভুল হিসাবে অর্থ চলে যাওয়ার মতো ঝুঁকি এড়াতে গ্রাহকের সচেতন থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে লেনদেন ব্যর্থ হলে দ্রুত অর্থ ফেরত এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাংলা কিউআরের নীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নির্ধারণে ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কার্যকরী কমিটি কাজ করছে। পাশাপাশি গভর্নরের সভাপতিত্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটিও এ বিষয়ে কাজ করছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ডিজিটাল অর্থনীতির আওতায় আনা বাংলা কিউআরের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একটি একক আন্তঃব্যবহারযোগ্য কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে বাংলা কিউআরকে প্রতিষ্ঠিত করার এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের নগদনির্ভর লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক সেবার পরিধিও আরও বাড়তে পারে।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে পিটুপি লেনদেন চালু হওয়ার ফলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার মার্চেন্ট পেমেন্টের গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করবে। এর মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে সুবিধাটির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে গ্রাহকদের গ্রহণযোগ্যতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ওপর। বাংলা কিউআরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় সহজ, দ্রুত ও আন্তঃব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল লেনদেনকে আরও বিস্তৃত করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত