প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্গাপূজা এলেই বাঙালির জীবনে ফিরে আসে উৎসব, স্মৃতি, পারিবারিক মিলন এবং সাংস্কৃতিক আবেগের এক বিশেষ সময়। নতুন পোশাক, শাড়ি, সাজসজ্জা, পূজামণ্ডপে যাওয়া কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছু মিলিয়ে শরতের এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত অসংখ্য স্মৃতি। টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের কাছেও দুর্গাপূজা তেমনই এক আবেগের সময়। তাঁর কাছে এটি কেবল কয়েক দিনের উৎসব নয়; বরং শিকড়, সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ অধ্যায়।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের পূজার ভাবনা, সাজপোশাক এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন ঋতুপর্ণা। তাঁর কথায় উঠে এসেছে ছোটবেলা থেকে দুর্গাপূজাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই আবেগ, যা সময়ের সঙ্গে বদলায়নি। বরং দীর্ঘ অভিনয়জীবন ও ব্যস্ততার মধ্যেও পূজার সময়টিকে তিনি আলাদা করে অনুভব করেন।
ঋতুপর্ণার কাছে দুর্গাপূজা চার দিনের একটি আনুষ্ঠানিক উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য। পূজার দিনগুলো তাঁর কাছে যেন নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ। উৎসবের বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি এর আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই দুর্গাপূজার প্রতি তাঁর যে টান, তা এখনো একই রকম রয়েছে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে, পেশাগত ব্যস্ততা বেড়েছে, কাজের ধরন বদলেছে, কিন্তু পূজাকে ঘিরে তাঁর আবেগে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং প্রতি বছর পূজা এলে শৈশবের নানা স্মৃতি নতুন করে মনে পড়ে।
পূজার সাজের ক্ষেত্রেও ঋতুপর্ণার পছন্দ বেশ স্বতন্ত্র। অতিরিক্ত চাকচিক্য বা আড়ম্বরের বদলে তিনি ঐতিহ্যবাহী অথচ মার্জিত সাজকে গুরুত্ব দেন। বড় টিপ, চোখভরা কাজল এবং লাল-সাদা কিংবা হালকা রঙের সুতি শাড়ি—এই সহজ ও পরিচিত বাঙালি সাজের মধ্যেই তিনি সৌন্দর্যের আলাদা মাত্রা খুঁজে পান।
তাঁর এই পছন্দের মধ্যে যেমন রয়েছে বাঙালিয়ানার পরিচিত ছাপ, তেমনি রয়েছে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যও। ঋতুপর্ণার মতে, পূজার সাজে অতিরিক্ত কিছু যোগ করার প্রয়োজন নেই। বরং পোশাক ও সাজে নিজের স্বতন্ত্রতা ফুটে উঠলেই সেটি পূর্ণতা পায়। একটি সাধারণ শাড়ি, টিপ ও কাজলের মতো পরিচিত উপকরণও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশে আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করতে পারে।
এবারের পূজায় তিনি কীভাবে সাজবেন এবং কলকাতায় থাকবেন কি না—এমন প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, পূজার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করার চেয়ে নিজের পছন্দ ও বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাকই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের সাজ তাঁর কাছে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগেরও একটি মাধ্যম।
পূজার সময় কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঋতুপর্ণা জানান, উৎসবের সময়ে আলাদা করে নিজের জন্য কেনাকাটা করার মতো সময় সবসময় তাঁর হাতে থাকে না। অভিনয় ও অন্যান্য পেশাগত ব্যস্ততার কারণে পূজার আগে দীর্ঘ সময় ধরে কেনাকাটা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবে শাড়ির প্রতি তাঁর ভালোবাসা সারা বছরই রয়েছে।
এই ভালোবাসার কারণেই বছরজুড়ে ধীরে ধীরে তাঁর শাড়ির সংগ্রহ সমৃদ্ধ হয়। পূজার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে সবকিছু একসঙ্গে কেনার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে পছন্দের শাড়ি সংগ্রহ করেন তিনি। ফলে উৎসবের সময় নতুন করে বড় ধরনের কেনাকাটার প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে শাড়ি শুধু পোশাক নয়, অনেক সময় একটি স্মৃতি বা সম্পর্কেরও বাহক।
ঋতুপর্ণা জানিয়েছেন, অনেক মানুষ ভালোবাসা দিয়ে তাঁর জন্য বিশেষভাবে শাড়ি তৈরি করে দেন। এসব শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আলাদা আলাদা গল্প ও অনুভূতি। কোনো শাড়ি হয়তো কোনো বিশেষ মানুষের দেওয়া, কোনোটি বিশেষ কোনো উপলক্ষকে ঘিরে তৈরি, আবার কোনোটি হয়তো তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পছন্দকে মাথায় রেখে নকশা করা। ফলে এসব পোশাকের মূল্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; আবেগের জায়গা থেকেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
একজন অভিনেত্রীর জন্য পোশাক অবশ্যই তাঁর জনপরিচয়ের অংশ। পর্দার বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসব কিংবা সামাজিক আয়োজনে তাঁর পোশাক নিয়েও ভক্তদের আগ্রহ থাকে। তবে ঋতুপর্ণার কথায় স্পষ্ট, নিজের পোশাকের ক্ষেত্রে তিনি কেবল দর্শকের প্রত্যাশা অনুসরণ করেন না। নিজের পছন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক নির্বাচন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
দুর্গাপূজার সঙ্গে শাড়ির সম্পর্ক বাঙালি সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের। উৎসবের দিনগুলোতে নতুন শাড়ি পরা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাজগোজ করা এবং পূজামণ্ডপে যাওয়া অনেকের কাছেই শৈশবের স্মৃতির অংশ। ঋতুপর্ণার বক্তব্যেও সেই পরিচিত আবেগের প্রতিফলন পাওয়া যায়। একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হয়েও তাঁর পূজার পছন্দে রয়েছে সাধারণ বাঙালি জীবনের পরিচিত উপাদান।
পূজা তাঁর কাছে একই সঙ্গে আনন্দ ও নস্টালজিয়ার সময়। শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় এবং বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আবহ—সব মিলিয়ে এই সময়টিকে তিনি বিশেষভাবে অনুভব করেন। তাই বয়স ও সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও দুর্গাপূজাকে ঘিরে তাঁর আবেগ একই থেকে গেছে।
ঋতুপর্ণার এই ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎসবের সঙ্গে নিজের শিকড়ের সম্পর্ক। আধুনিক জীবনযাত্রা ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু কিছু উৎসব এখনো মানুষকে নিজের সংস্কৃতি ও পারিবারিক স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নেয়। দুর্গাপূজাও তেমনই একটি উপলক্ষ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর বক্তব্যে তাই ফ্যাশনের পাশাপাশি উঠে এসেছে ঐতিহ্যের কথাও। লাল-সাদা শাড়ি, বড় টিপ, কাজল কিংবা সুতি কাপড়—এসব তাঁর কাছে শুধু সাজের উপকরণ নয়; বাঙালিয়ানার পরিচিত চিহ্ন। একই সঙ্গে নিজের জন্য তৈরি করে দেওয়া বিশেষ শাড়িগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প ও ভালোবাসার কথাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যস্ত অভিনয়জীবনের মাঝেও দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই আবেগ ঋতুপর্ণার ব্যক্তিগত জীবনের একটি পরিচিত অংশ হয়ে আছে। উৎসবের সময় তিনি কী পরবেন বা কোথায় থাকবেন, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতি। তাই তাঁর কাছে দুর্গাপূজা কেবল সাজসজ্জা বা আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং স্মৃতি, সংস্কৃতি ও নিজের পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগের একটি সময়।
বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি দুর্গাপূজা সামনে রেখে ঋতুপর্ণার এই ভাবনা উৎসবের বাহ্যিক আয়োজনের বাইরে এর মানবিক দিকটিও সামনে আনে। নতুন পোশাক বা জমকালো সাজের পাশাপাশি উৎসবের প্রকৃত আনন্দ অনেক সময় নিহিত থাকে প্রিয় মানুষ, পুরোনো স্মৃতি এবং নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগে। ঋতুপর্ণার কাছে দুর্গাপূজার সৌন্দর্যও যেন সেখানেই—নিজের শিকড়কে মনে রেখে আনন্দের সময়টিকে আপন করে নেওয়া।