শাহজালাল বিমানবন্দর প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ৮৪৮ কোটি টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
শাহজালাল বিমানবন্দর প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ৮৪৮ কোটি টাকা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের চলমান প্রকল্পে আবারও বাড়ল ব্যয় ও সময়। তৃতীয় দফায় সংশোধনের পর প্রকল্পটির ব্যয় নতুন করে প্রায় ৮৪৮ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা আরও এক বছর বাড়িয়ে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকায়।

রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতায় উন্নীত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নাধীন। শুরুতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় সংশোধন করতে হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনের ফলে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পটির অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকায়। এতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে মোট ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি প্রকল্প ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা।

একনেক বৈঠকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের বড় একটি অংশ আসবে সরকারি তহবিল থেকে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১০ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৫ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩৮২ কোটি টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে পাঁচটি সংশোধিত এবং অন্যগুলো নতুন প্রকল্প।

শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। তখন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। ওই বছরের জুনে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে নির্মাণকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। একই সময়ে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ানো হয়।

প্রথম সংশোধনের পর প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এবার তৃতীয় সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় আরও ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ শেষ করার সময় আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন সময়সীমা অনুযায়ী আগামী বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটির বাড়তি ব্যয়ের পেছনে বিভিন্ন ধরনের বাস্তবায়নগত বিষয় রয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় বাড়ার সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী, পরামর্শক সেবা, নির্মাণকাজ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ব্যয়ের পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে একাধিকবার সময় ও ব্যয় সংশোধনের বিষয়টি সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।

সর্বশেষ সংশোধনের পর প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন থাকছে ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। বাকি ১৭ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা বেবিচক।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটির গুরুত্ব রয়েছে। ফলে এর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দেশের সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলে যাত্রীসেবা, বিমান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে বারবার সময় বাড়ায় নির্ধারিত সুবিধা পাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যাচ্ছে। নতুন সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে চলা অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার পথ আরও পরিষ্কার হবে।

এদিকে একনেক বৈঠকে বড় প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মান উন্নত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের পর পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই দুর্বল হলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

সম্ভাব্যতা যাচাইকে আরও কার্যকর করতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তব পরিস্থিতি, ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা, সময়সীমা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অবহেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরিকল্পনায় যথাযথ তথ্য ও বাস্তবভিত্তিক হিসাব না থাকলে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের সংশোধন কমিয়ে আনতে প্রকল্প অনুমোদনের আগের পর্যায়েই যাচাই-বাছাই জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

একনেকে অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যেও দেশের বিভিন্ন খাতের অবকাঠামো ও সেবা উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবারকল্যাণ খাতে যক্ষ্মা, এইডস ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। অর্থ খাতের ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২-ও অনুমোদন করা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ খাতে চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে বিদ্যমান শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের রৌফাবাদে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল ভবন সম্প্রসারণের প্রকল্প রয়েছে। পানি সম্পদ খাতে ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকায় সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, পাশাপাশি ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার কয়েকটি এলাকা মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার প্রকল্পও অনুমোদন হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা খাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা ও দুটি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালুর সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। একই সঙ্গে রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।

এ ছাড়া ফেনীর সোনাগাজীতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রকল্পও রয়েছে অনুমোদিত তালিকায়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা, ভূমি প্রশাসন, সামাজিক সেবা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তবে সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সময়ের সঙ্গে ব্যয় বাড়ার বিষয়টি ভবিষ্যৎ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হলে দীর্ঘদিনের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হবে। এখন নজর থাকবে সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো দেশের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা যায় কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত