মরক্কোর প্রথম নারী সরকারপ্রধান ফাতিমা মানসুরি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
মরক্কোর প্রথম নারী সরকারপ্রধান ফাতিমা মানসুরি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মরক্কোর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফাতিমা জাহরা আল মানসুরি। মঙ্গলবার রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো মরক্কোর সরকারপ্রধানের পদে কোনো নারী দায়িত্ব পেলেন। একই সঙ্গে আরব বিশ্বে সরকারপ্রধান হওয়া দ্বিতীয় নারী হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

৫০ বছর বয়সী ফাতিমা মানসুরি মরক্কোর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। আইন বিষয়ে শিক্ষিত এই রাজনীতিক এর আগে দেশটির নগর পরিকল্পনা, আবাসন ও নগরনীতি-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মারাকেশের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসা এই নেত্রী এখন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্বের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

রাজপ্রাসাদের ঘোষণায় বলা হয়েছে, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ রাজধানী রাবাতের রাজপ্রাসাদে মানসুরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এবং নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের মধ্য থেকেই রাজা সরকারপ্রধান নিয়োগ করেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মানসুরির দল অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি বা পিএএম সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পর তার নিয়োগের পথ তৈরি হয়।

নিয়োগের পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় মানসুরি এ ঘটনাকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবার একজন নারী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশটির নারীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সরকারপ্রধানের পদে কোনো নারী না থাকায় তার নিয়োগকে দেশটির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই ঐতিহাসিক নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে মানসুরির সামনে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে পিএএম ৩৯৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ৯৭টি আসন পেয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৯৮টি আসন। ফলে এককভাবে সরকার গঠন করার মতো আসন পায়নি দলটি। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এখন অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করে একটি কার্যকর জোট গঠন করতে হবে।

নির্বাচনের ফলাফলে পিএএমের পর ন্যাশনাল র‍্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস বা আরএনআই ৬৬টি এবং ইস্তিকলাল পার্টি ৬৫টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা পিজেডি ৫৪টি আসন পেয়েছে। ফলে নতুন সরকার গঠনে বিভিন্ন দলের অবস্থান এবং পারস্পরিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পিজেডি ইতিমধ্যে বিরোধী দলে থাকার অবস্থান জানিয়েছে বলে নির্বাচনী ফলাফল-পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

পিএএম ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দলটি মরক্কোর রাজনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটির সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া তাকে সরকার গঠনের নেতৃত্বের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় মানসুরির জন্য জোট গঠনই হবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি।

নতুন সরকারের সামনে শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, অর্থনীতি ও জনসেবার ক্ষেত্রেও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশটিতে উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে আসে, যা রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের শাসনামলে তুলনামূলকভাবে নিম্ন পর্যায়ের উপস্থিতির একটি উদাহরণ। তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অনাগ্রহ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়টিও নির্বাচনী পরিবেশে আলোচিত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় মানসুরির সরকারকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ এবং তরুণদের উদ্বেগ মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি। মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল যৌথভাবে ওই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। এই বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজনকে সামনে রেখে মরক্কোতে অবকাঠামো, পরিবহন, পর্যটন, ক্রীড়া স্থাপনা ও অন্যান্য খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সরকারকে এসব বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের ওপর নজর দিতে হবে।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতির পাশাপাশি সরকারের জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন প্রশাসনের নীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং পার্লামেন্টে কার্যকর সমর্থন।

ফাতিমা মানসুরির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মারাকেশের মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব পালন। নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে জাতীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেও কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েছে। ২০২৩ সালের মারাকেশ ভূমিকম্পের পর স্থানীয় পর্যায়ে তার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।

আরব বিশ্বের রাজনৈতিক পরিসরেও তার নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। তিউনিসিয়ার নাজলা বুদেন ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার পর ফাতিমা মানসুরি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেলেন। ফলে উত্তর আফ্রিকার দুই দেশে নারীদের সর্বোচ্চ নির্বাহী পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার নজির তৈরি হলো।

তবে মানসুরির সামনে থাকা দায়িত্ব শুধু ঐতিহাসিক প্রতীকী অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাকে এখন এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে, যেটি পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। জোটের অংশীদার নির্বাচন, মন্ত্রণালয় বণ্টন, নীতিগত সমঝোতা এবং সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ—সবকিছুই তার নেতৃত্বের প্রথম পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে উঠবে।

মরক্কোর রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের নতুন এই অধ্যায় তাই একই সঙ্গে প্রতীকী ও বাস্তব গুরুত্ব বহন করছে। প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ফাতিমা মানসুরির নিয়োগ দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে। এখন তার নেতৃত্বে গঠিত সরকার কীভাবে রাজনৈতিক জোটকে কার্যকর রাখে, জনসাধারণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশার জবাব দেয় এবং ২০৩০ বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশের বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে—সেদিকেই নজর থাকবে মরক্কোর নাগরিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত