প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মৌলভীবাজারে আলোচিত কলেজছাত্র রেজাউল করিম নাঈম হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। প্রায় তিন বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে তরুণ এই শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বুধবার মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও অপেক্ষার পরিবেশ।
মামলার রায় ঘোষণা করেন মৌলভীবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রবিউল আউয়াল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নুরুল ইসলাম, সায়মন ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম রনি ও আনোয়ার হোসেন। তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম ও সায়মন ইসলাম কারাগারে রয়েছেন। অপর দুই আসামি নাহিদুল ইসলাম রনি ও আনোয়ার হোসেন পলাতক বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন কারাগারে থাকা আসামিরা এবং মামলার অন্য সংশ্লিষ্টরা। পলাতক দুই আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
অন্যদিকে মামলায় খালাস পাওয়া পাঁচজন হলেন ইমন মিয়া, আল-আমিন, সাকির আহমদ, পারভীন বেগম ও রোকসানা বেগম। আদালতের রায়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তারা খালাস পেয়েছেন। একটি হত্যা মামলায় একই সঙ্গে একাধিক আসামির সাজা এবং কয়েকজনের খালাসের মধ্য দিয়ে আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যেক আসামির দায় আলাদাভাবে বিবেচনা করেছেন—এমনটাই প্রতীয়মান হয় রায়ের ফলাফল থেকে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মৌলভীবাজারের বর্ষিজোড়া এলাকায় একটি ফেসবুক পোস্টে ছবি প্রকাশকে কেন্দ্র করে রেজাউল করিম নাঈমের সঙ্গে নাহিদুল ইসলাম রনির কথা-কাটাকাটি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করার মতো বিষয় কীভাবে পরে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়, সেই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে এই হত্যা মামলার মূল প্রেক্ষাপট হয়ে ওঠে।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়, বিরোধের জেরে রনি, তার বাবা নুরুল ইসলামসহ কয়েকজন নাঈমকে ধরে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নাঈমকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে পথেই তার মৃত্যু হয়। স্বজনদের কাছে একজন তরুণ কলেজছাত্রের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয় হয়ে থাকেনি; পরিবারের জন্য এটি হয়ে ওঠে অপূরণীয় ক্ষতির ঘটনা।
নাঈমের মৃত্যুর পর তার বাবা চেরাগ মিয়া বাদী হয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। এরপর তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আদালতের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মামলাটি বিচারপর্বে এগিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে নিহতের পরিবার ও মামলার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অপেক্ষা ছিল। অবশেষে ঘটনার প্রায় তিন বছর পর আদালত রায় ঘোষণা করলেন।
মামলাটির বিচার শেষ হওয়ার সময়কাল নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র তিন বছরের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ করে আদালত রায় দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করেই আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
একজন কলেজছাত্রের হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কারণ, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে নিহতের পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষার মধ্যে থাকতে হয়। সেই দিক থেকে তিন বছরের মধ্যে বিচার শেষ হয়ে রায় ঘোষণার বিষয়টি মামলার অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখানেই সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার সুযোগ থাকে। ফলে নিম্ন আদালতের এই রায়ের পর মামলাটি পরবর্তী আইনি ধাপেও যেতে পারে। পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে তাদের গ্রেপ্তার ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নাঈম হত্যা মামলার ঘটনাপ্রবাহ আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য বিরোধ বা মতবিরোধ কখনো কখনো বাস্তব জীবনে বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে। একটি ছবি পোস্টকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া কথাকাটাকাটি শেষ পর্যন্ত একজন তরুণের প্রাণহানির ঘটনায় গড়িয়েছে বলে মামলার বিবরণে উঠে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিহত নাঈমের পরিবারে একজন তরুণ সদস্যকে হারানোর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আদালতের রায় তা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবারকে আইনি প্রতিকারের একটি পথ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচজন আসামির খালাসের মধ্য দিয়ে আদালত অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।
আদালতের রায়ের পর এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামনে রয়েছে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিল বা সংশ্লিষ্ট আইনগত সুযোগ গ্রহণের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। আর পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়টিও মামলার পরবর্তী অগ্রগতিতে গুরুত্ব পাবে।
২০২৩ সালের নভেম্বরের সেই ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ঘোষিত এই রায় মৌলভীবাজারে আলোচিত নাঈম হত্যা মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। একজন তরুণের মৃত্যু ঘিরে শুরু হওয়া তদন্ত, সাক্ষ্য ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আদালত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দিয়েছেন। এখন রায়ের পরবর্তী আইনগত কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে থাকবে নিহতের পরিবার, মামলার আসামিরা এবং সংশ্লিষ্টরা।