ইইউতে ফেরার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে যুক্তরাজ্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ইইউতে ফেরার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে যুক্তরাজ্য

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রেক্সিটের এক দশক পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিভিন্ন পথ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এখনই ইইউতে ফেরার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন ঘোষণা তিনি দেননি।

বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বার্নহাম বলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে সরকারকে বাস্তবসম্মতভাবে সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে। তার বক্তব্যে বর্তমান ব্রেক্সিট ব্যবস্থার সমালোচনাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, ব্রেক্সিটের পরের পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের জন্য প্রত্যাশিত সুবিধার তুলনায় বেশি ক্ষতির কারণ হয়েছে। সেই কারণে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের ক্ষেত্রে কোন কোন পদক্ষেপ বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে ভাবতে চান তিনি।

বার্নহামের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ইইউতে পুনরায় যোগদানের সম্ভাবনাকে তিনি সরাসরি নাকচ করেননি। বরং যুক্তরাজ্য বর্তমান অবস্থানেই থাকতে পারে, ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কোনো কাঠামোয় যেতে পারে অথবা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ বেছে নিতে পারে—এমন বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্তের আগে এসব বিকল্পের বাস্তবতা, সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধা বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

২০১৬ সালের গণভোটে যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট পড়ার পর ব্রেক্সিট দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। পরবর্তী কয়েক বছরে ইইউ থেকে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ এবং নতুন বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এখন এক দশক পর বার্নহাম সরকারের অধীনে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর আলোচনা আবারও ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

বার্নহাম ২৯ সেপ্টেম্বর লিভারপুলে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বড় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ইউরোপের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং ব্রেক্সিটকে গত এক দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানান। লেবার পার্টির প্রকাশিত ভাষণেও ইউরোপের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের এই অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আসন্ন যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলন। ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বার্নহাম এর আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, অভিবাসন, ইউক্রেন এবং অন্যান্য অভিন্ন চ্যালেঞ্জে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

ফলে ইইউতে পুনরায় যোগদানের আলোচনা এখনই কোনো আনুষ্ঠানিক পুনঃপ্রবেশ প্রক্রিয়া নয়। বরং ব্রিটিশ সরকারের সামনে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সম্পর্ক বজায় রাখা, আরও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে ইইউর সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্কের দিকে যাওয়া—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কোন পথ শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ওপর।

বার্নহামের অবস্থান ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো সরকারের এই অবস্থানকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। ফলে ব্রেক্সিট নিয়ে বহু বছর ধরে চলা বিভাজন নতুন রাজনৈতিক আলোচনার রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনে সরকারের এই উদ্যোগকে ব্রেক্সিট বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে আসার মতো একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে বার্নহামের ইউরোপনীতি শুধু ইইউ সদস্যপদকে ঘিরে নয়। তার সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে ইউরোপের সঙ্গে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার মাধ্যমে ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে সীমান্ত, নিরাপত্তা, ইউক্রেন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি বার্নহাম তার প্রথম দলীয় সম্মেলনের ভাষণে আরও বেশ কিছু বড় নীতিগত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে আগামী পার্লামেন্টে একটি জাতীয় পরিচর্যা সেবা চালুর পরিকল্পনা। সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বর্তমান ট্রিপল লক বজায় থাকবে। এরপর পেনশন বৃদ্ধির নিয়মে পরিবর্তন এনে মূল্যস্ফীতি বা ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, তার ভিত্তিতে পেনশন বাড়ানোর পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে আয়ের প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও এর মূল্য ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। এই পরিবর্তন থেকে সঞ্চিত অর্থ জাতীয় পরিচর্যা সেবা গঠনে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বার্নহাম একই সম্মেলনে নির্বাচনী সংস্কার নিয়েও উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি একটি জাতীয় কমিশন গঠনের কথা জানিয়েছেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হবে। লেবার পার্টি আগামী সাধারণ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিকল্পনাও জানিয়েছে।

এদিকে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকার আসন্ন শীতের জ্বালানি ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বার্নহাম জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি বিলের চাপ কমাতে সরকার কাজ করছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্পখাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা—এসব বিষয়ও ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের আলোচনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে।

যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের প্রভাব কেবল কূটনীতি বা সংসদীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, ভ্রমণ, ব্যবসা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার ওপরও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে। তাই ইইউতে পুনরায় যোগদানের প্রশ্নটি সামনে এলেও বাস্তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়।

সব মিলিয়ে, অ্যান্ডি বার্নহামের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে যুক্তরাজ্যের ইউরোপনীতি নিয়ে একটি নতুন পর্যালোচনার সূচনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ইইউতে সরাসরি ফিরে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি; বরং সরকার সম্পর্কের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা ও মূল্যায়নের দিকে এগোচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাজ্য-ইইউ বৈঠক এবং সরকারের পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো থেকে এই সম্পর্ক কোন দিকে এগোতে পারে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত