জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, সদরপুর বাজারে পরিচালিত অভিযানে খান ফার্মেসিকে ১০ হাজার টাকা, ভোলানাথ ফার্মেসিকে ৫ হাজার টাকা, লোকনাথ ফার্মেসিকে ৮ হাজার টাকা এবং মেসার্স চৌধুরী মেডিক্যাল হলকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহরিয়ার আশরাফ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক নাজমুল হাসান।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ওষুধ বিক্রিতে আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন পণ্যের বিক্রি প্রতিরোধ করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় তদারকি জোরদার করা।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে চারটি ফার্মেসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এর মধ্যে খান ফার্মেসিকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। লোকনাথ ফার্মেসিকে ৮ হাজার, ভোলানাথ ফার্মেসিকে ৫ হাজার এবং মেসার্স চৌধুরী মেডিক্যাল হলকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সব মিলিয়ে জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার টাকা।
অভিযান-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি, যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় ড্রাগ লাইসেন্স না থাকাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঠিক কোন অভিযোগে কত টাকা জরিমানা করা হয়েছে, তা পৃথকভাবে নিশ্চিত করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযানের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ওষুধের দোকান সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। জ্বর, ব্যথা, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে মানুষ প্রায়ই স্থানীয় ফার্মেসির ওপর নির্ভর করেন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে বিক্রি হওয়া ওষুধের মান, মেয়াদ এবং বৈধতা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সদরপুর বাজারের অন্য অনেক ফার্মেসি বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, বাজারে প্রায় ৫০টি ওষুধের দোকান থাকলেও অভিযান চলাকালে চারটি প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। অন্য দোকানগুলো বন্ধ থাকায় সেগুলোতে একই ধরনের অনিয়ম রয়েছে কি না, তা যাচাই করা যায়নি বলে তাঁরা মনে করছেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকি না থাকলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, শুধু এক দিনের অভিযান পরিচালনা করে বাজারের সব অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়। বরং নির্দিষ্ট বিরতিতে পরিদর্শন, ওষুধের উৎস যাচাই এবং লাইসেন্সের বৈধতা পরীক্ষা করা হলে অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে।
তবে দোকান বন্ধ থাকার বিষয়টি নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। সদরপুর ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান হিরু জানিয়েছেন, সেদিন অনেক ওষুধের দোকানের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ছিল। ফলে বাজারের অন্য দোকানগুলো বন্ধ থাকার পেছনে সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সাপ্তাহিক বন্ধের বক্তব্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে বাজারের দোকানগুলোর নির্ধারিত বন্ধের দিন, অভিযানের সময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো দোকান বন্ধ থাকলেই সেখানে অবৈধ ওষুধ বিক্রি হচ্ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে বন্ধ থাকার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যাচাইয়ের প্রয়োজনও শেষ হয়ে যায় না।
সদরপুর বাজারের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, কিছু ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকা থেকে কম দামে নকল ওষুধ এনে বিক্রি করেন। তাঁদের এই অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট সরবরাহকারী, ওষুধের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো মামলার তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগটিকে আপাতত স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে নকল ওষুধের সম্ভাব্য সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা জরুরি। কোনো ওষুধের প্যাকেট, প্রস্তুতকারকের পরিচয়, ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কিংবা ক্রয়সংক্রান্ত চালানে অসংগতি পাওয়া গেলে সেগুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রয়োজন হলে সন্দেহজনক ওষুধের নমুনা পরীক্ষা এবং সরবরাহের উৎস অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ।
নকল ওষুধের ঝুঁকি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো ওষুধে প্রয়োজনীয় সক্রিয় উপাদান না থাকলে, উপাদানের পরিমাণ ভুল হলে কিংবা ক্ষতিকর পদার্থ মিশে থাকলে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ক্ষেত্রেও ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাই ওষুধ কেনার সময় প্যাকেটের মেয়াদ, প্রস্তুতকারকের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার পাশাপাশি সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
সদরপুরে অভিযানকে ঘিরে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি, অভিযান বন্ধ রাখার উদ্দেশ্যে সদরপুর ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ওষুধের দোকান থেকে এক হাজার, দুই হাজার, তিন হাজার টাকা এবং বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব অর্থ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দিয়ে অভিযান বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো রসিদ, আর্থিক লেনদেনের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর যাচাইযোগ্য বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
এ বিষয়ে ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান হিরুর বক্তব্য পাওয়া গেলেও অর্থ সংগ্রহ ও অভিযান বন্ধ রাখার অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে সমিতির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান পরিচালনা করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ওষুধের দোকানে নিয়মিত তদারকি থাকলে মেয়াদোত্তীর্ণ, অনুমোদনহীন বা সন্দেহজনক ওষুধ বিক্রির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, নিয়মিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বাজারের ফার্মেসিগুলো পরিদর্শন করবে।
কার্যকর তদারকির জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ড্রাগ লাইসেন্সের বৈধতা, ওষুধ সংরক্ষণের পরিবেশ, পণ্যের মেয়াদ, ক্রয়সংক্রান্ত নথি এবং অনুমোদিত উৎস থেকে ওষুধ সংগ্রহের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতন করা হলে অনিচ্ছাকৃত ভুল এবং ইচ্ছাকৃত অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করাও সহজ হবে।
ক্রেতাদের জন্যও সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ কেনা, প্যাকেটের মেয়াদ যাচাই করা এবং অস্বাভাবিকভাবে কম দামে বিক্রি হওয়া সন্দেহজনক ওষুধ সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো ওষুধের গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট বা সংশ্লিষ্ট ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহরিয়ার আশরাফ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া ফার্মেসি পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওষুধের দোকানগুলোতে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইন অমান্য করে ওষুধ বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
প্রশাসনের এ অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন নির্ভর করবে নিয়মিত পরিদর্শন, আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর। সদরপুর বাজারের যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনিয়ম সংশোধন হয়েছে কি না, পাশাপাশি বন্ধ থাকা দোকানগুলোর কার্যক্রম ও লাইসেন্সের বৈধতা যাচাই করা হলে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
সদরপুরের এই অভিযান আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ওষুধের নিরাপত্তা কেবল ব্যবসায়ী বা প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়; এটি রোগী ও তাঁদের পরিবারের জীবন-স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা, নিয়মিত সরকারি তদারকি এবং অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মানসম্মত ওষুধ কিনতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত