মাকে খুঁজতে গিয়ে পুকুরে পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার
মাকে খুঁজতে গিয়ে পুকুরে পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে বাড়ির পেছনের পুকুরের পানিতে ডুবে রাইসা আক্তার নামে দেড় বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মাকে খুঁজতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পুকুরে পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। বুধবার বিকেলে উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়নের ভোলাকোট গ্রামের সিরাজ মিয়ার বাড়িতে এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত রাইসা আক্তার ওই বাড়ির সিরাজ মিয়ার নাতনি এবং খোকন মিয়ার মেয়ে। মাত্র দেড় বছর বয়সী শিশুটির এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। একই সঙ্গে ঘটনাটি এলাকায়ও বিষাদের পরিবেশ তৈরি করেছে। একটি ছোট শিশুর এমন করুণ পরিণতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের অনেকেই পরিবারটির প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে রাইসা ঘুম থেকে ওঠে। ঘুম থেকে উঠে সে মাকে খুঁজতে থাকে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে শিশুটি বাড়ির পেছনের দিকে চলে যায়। সেখানে থাকা পুকুরের কাছে গিয়ে অসাবধানতাবশত পা পিছলে পানিতে পড়ে যায়। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেননি।

কিছু সময় পর মেয়েকে দেখতে না পেয়ে তার মা লাকী বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় শিশুটিকে খুঁজতে শুরু করেন। বাড়ির আশপাশে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তার চিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্য ও আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে বাড়ির পেছনের পুকুরে শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের পর রাইসাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা করে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিশুটিকে বাঁচানোর আশায় পরে তার চাচা সুমন হোসেন তাকে পার্শ্ববর্তী চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

একটি শিশুকে হারানোর এই ঘটনা পরিবারের জন্য যে কতটা আকস্মিক ও বেদনাদায়ক, তা সহজেই অনুমেয়। কিছুক্ষণ আগেও যে শিশু ঘুম থেকে উঠে মাকে খুঁজছিল, অল্প সময়ের ব্যবধানে তার নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনা স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মা লাকী বেগমের জন্য ঘটনাটি হয়ে উঠেছে অসহনীয় এক বেদনার অভিজ্ঞতা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ভোলাকোট ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্য মাঈন উদ্দিন কাজল জানান, শিশুটি মাকে খুঁজতে গিয়ে বাড়ির পেছনের পুকুরের পানিতে পড়ে মারা গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত। শিশুটির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গ্রামবাংলার অনেক বাড়ির পাশেই পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয় রয়েছে। এসব জলাশয় একদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকলেও ছোট শিশুদের জন্য তা বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হাঁটতে শেখা শিশুদের ক্ষেত্রে মুহূর্তের অসতর্কতাও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। রামগঞ্জের এই ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

দেড় বছরের শিশুদের সাধারণত চারপাশ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকে না। তারা কৌতূহলবশত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে এবং বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না। ফলে বাড়ির আশপাশে পুকুর বা অন্য কোনো জলাশয় থাকলে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। শিশুরা কখন ঘুম থেকে উঠছে, কোথায় যাচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে রয়েছে—এসব বিষয়ে নজর রাখা জরুরি হয়ে পড়ে।

রাইসার পরিবারের ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনাটি ঘটেছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। ঘুম থেকে উঠে শিশুটি মাকে খুঁজতে বের হয়েছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাকে নজরে না রাখার সুযোগে সে বাড়ির পেছনের পুকুরের কাছে চলে যায়। পরে অনেকক্ষণ শিশুটিকে দেখতে না পেয়ে তার মা খোঁজ শুরু করেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোকের কারণ নয়, বরং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। বাড়ির কাছাকাছি থাকা পুকুর, খাল, ডোবা কিংবা জলাশয়ের চারপাশে নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা, শিশুদের চলাচলের জায়গা থেকে জলাশয় আলাদা রাখা এবং ছোট শিশুদের একা বাইরে যেতে না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও রাইসার মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারি ও পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। একটি পরিবারের আনন্দের কেন্দ্র হয়ে থাকা শিশুটির এমন আকস্মিক মৃত্যু স্বজনদের জন্য গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। প্রতিবেশীরাও এমন ঘটনায় নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।

শিশু পানিতে পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা, শিশুদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং বাড়ির আশপাশের জলাশয়কে নিরাপদ রাখার উদ্যোগ এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রামগঞ্জের ভোলাকোট গ্রামের রাইসার মৃত্যু তাই কেবল একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি একটি পরিবারের জীবনে নেমে আসা অপূরণীয় শোকের গল্প। যে শিশু কিছুক্ষণ আগেও মাকে খুঁজছিল, তার আর ফিরে আসা হলো না। স্বজনদের জন্য এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল একটি দুর্ঘটনা। শিশুটির পরিবার এখন শোক সামলানোর চেষ্টা করছে। অল্প বয়সী রাইসার আকস্মিক মৃত্যু পরিবারটির জীবনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হবে তাদের। পাশাপাশি ঘটনাটি আশপাশের পরিবারগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে—বাড়ির কাছে জলাশয় থাকলে ছোট শিশুদের নিরাপত্তায় সামান্য অসতর্কতাও কখনো কখনো অপূরণীয় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com