সাজেকে অষ্টম দিনেও অবরোধ, কাটেনি অচলাবস্থা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৫ বার
সাজেকে অষ্টম দিনেও অবরোধ, কাটেনি অচলাবস্থা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে টানা অষ্টম দিনের মতো অবরোধ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, প্রশাসনের পূর্বঘোষিত আশ্বাস বাস্তবায়ন এবং সাজেক এলাকা থেকে জনসংহতি সমিতি—জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা এ অবরোধে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ। বৃহস্পতিবার সকালেও সড়কের কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করা হয়। ফলে সাজেকের সঙ্গে বাইরের এলাকার যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

অবরোধের কারণে পাহাড়ি এ পর্যটন এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও যোগাযোগব্যবস্থা আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। স্থানীয়দের মধ্যে একদিকে যেমন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনা হলেও মূল দাবিকে ঘিরে সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের পথ এখনো তৈরি হয়নি। গত ২৬ অক্টোবর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত পাঁচ দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতার কথা জানানো হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে বিবেচিত সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও মূল দাবিটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ কারণে আন্দোলনকারীদের অবরোধ প্রত্যাহারের পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। ফলে আলোচনা হলেও সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, মূল দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত আশ্বাস না পাওয়ায় কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার রাতে সংগঠনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচারে আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বলেন, সরকার তাদের প্রধান দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। সরকার প্রথমে এ দাবি বাস্তবায়নের জন্য এক মাস সময় চেয়েছিল। আন্দোলনকারীরা তিন দিন সময় দেওয়ার বিষয়ে সম্মত ছিলেন। পরে সরকার ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চাইলে তারা আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে রাজি হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে নিশ্চিত আশ্বাস না পাওয়ায় অবরোধ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। সরকার নতুন করে আলোচনায় বসতে চাইলে তারা প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, একদিকে আন্দোলনকারীরা তাদের প্রধান দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি চান, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনাও তারা খোলা রাখতে চাইছেন।

আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ২২ অক্টোবরের অবরোধকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি এবং নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত। উজো বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি ওই এলাকা থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে। হামলায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন, সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধের দাবিও করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধের দাবিও রয়েছে।

সাজেকের বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে গত কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় দুটি সংগঠন গত ১১ অক্টোবর থেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে প্রত্যাহার, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের দেওয়া আগের আশ্বাস বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে দাবিগুলোর প্রত্যাশিত সমাধান না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

২২ অক্টোবর অবরোধ শুরুর দিনই সাজেক পর্যটন এলাকায় বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়েন পর্যটকেরা। ওই দিন সাজেক ভ্যালিতে প্রায় দুই হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। পাহাড়ি সড়কে অবরোধ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে তাদের স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে পর্যটকদের গাড়িবহর সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি।

সাজেক বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, মেঘ, আঁকাবাঁকা সড়ক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে ভ্রমণে যান। স্থানীয় অনেক মানুষের জীবিকা পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, খাবারের দোকান, পরিবহন, স্থানীয় পণ্য বিক্রি এবং বিভিন্ন সেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়-রোজগার। ফলে দীর্ঘদিনের অবরোধ শুধু পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত করছে না, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।

বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেড়েছে। পর্যটক না আসায় আবাসন ও খাবারের ব্যবসায় যেমন মন্দা দেখা দিতে পারে, তেমনি পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের আয়ও কমে যায়। অন্যদিকে অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হলে স্থানীয় জীবনযাত্রায়ও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত দাবিগুলোর বাস্তবায়ন। তারা মনে করছেন, প্রধান দাবি নিয়ে সরকার থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। অন্যদিকে প্রশাসনের জন্যও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয়দের উদ্বেগ ও দাবিগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।

এ অবস্থায় সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কার্যকর সংলাপ এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। চারটি বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার পরও যেহেতু মূল দাবিটি নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে, তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আরও আলোচনা প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

অষ্টম দিনেও অবরোধ অব্যাহত থাকায় এখন সবার নজর পরবর্তী আলোচনার দিকে। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা হলে এবং প্রধান দাবিকে ঘিরে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ বের করা গেলে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতি এবং পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। সাজেকের পাহাড়ি জনপদে স্বাভাবিক জীবন ও পর্যটন কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে দ্রুত, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com