ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ বার
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি হকারদের জীবিকা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা মডেল চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অর্থনীতি বন্ধ করা, হকারদের বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ তৈরি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের অধিকার ও নগর ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। ঢাকার ফুটপাতকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দখল, উচ্ছেদ, পুনর্দখল এবং চাঁদা আদায়ের চক্রের স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি বিদ্যমান পদ্ধতির পরিবর্তে একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

পাটওয়ারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার ফুটপাতকে ঘিরে একটি বড় ধরনের চাঁদাবাজির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তিনি ২০১৬ সালে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, সে সময় ঢাকায় ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা অনুমান করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালে হকার্স ফেডারেশনের দেওয়া প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার হিসাবও উল্লেখ করা হয়। তবে এসব হিসাব ও অনুমানের উৎস, পদ্ধতি এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ফুটপাত রাষ্ট্রের সম্পদ হলেও সেখানে ব্যবসা করেন হকাররা। কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন চাঁদাবাজ চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে এসব অর্থ আদায়ের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তন হলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পাটওয়ারী তাঁর বক্তব্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের চাঁদাবাজ ও দখলদারদের তালিকা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, অপরাধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত ২৭৮ জনের মধ্যে ২৩০ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী। তবে এই ধরনের তালিকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই না করে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফুটপাত দখলমুক্ত করার নামে শুধু হকারদের সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন পাটওয়ারী। তাঁর যুক্তি, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ না করে হকার উচ্ছেদ করা হলে কিছুদিন পর একই এলাকায় আবার দখল ফিরে আসতে পারে। তখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে নতুন করে ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে উচ্ছেদ, পুনর্দখল ও চাঁদা আদায়ের একটি চক্র বারবার ফিরে আসতে পারে।

এই বাস্তবতায় হকারদের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার হকার ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের জন্য নিবন্ধন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন হলেও তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, ফুটপাতের ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়-রোজগারের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এক দিনের অভিযানে তাঁদের সরিয়ে দিলেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না।

বিকল্প কর্মসংস্থান কিংবা ব্যবসার উপযুক্ত জায়গা নিশ্চিত না করে হকারদের উচ্ছেদ করা হলে তাঁদের আবার ফুটপাতে ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন তিনি। কারণ একজন হকারের কাছে ফুটপাত কেবল একটি দখল করা জায়গা নয়; অনেকের জন্য এটি পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ চালানোর প্রধান আয়ের উৎস। তাই নগর ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে জীবিকার বাস্তবতাকেও পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

হকার ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিমধ্যে নীতিমালা, ডিজিটাল কার্ড এবং নির্ধারিত বিক্রয় এলাকার মতো বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাটওয়ারী। কতজন হকার নিবন্ধিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত ব্যবসার জায়গা পেয়েছেন এবং এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা হচ্ছে—এসব তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে হকার ব্যবস্থাপনার নামে নতুন করে অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কমিটিতে হকারদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা থাকা বিভিন্ন পক্ষকে একই কাঠামোর আওতায় আনলে কোন এলাকায় কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা তুলনামূলক বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে কোন এলাকায় কতজন হকার ব্যবসা করতে পারবেন, কোন সময়ে তাঁরা বসবেন এবং কী পরিমাণ বৈধ ফি দিতে হবে—এসব বিষয় নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের জায়গা, ক্রেতাদের উপস্থিতি, ব্যবসার ধরন এবং হকারদের আয়-ব্যয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছেন। এতে একদিকে পথচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে হকারদের জীবিকার সুযোগ রাখা যাবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বরাদ্দ প্রকাশ্য ডিজিটাল তালিকায় রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। সরকারি ফি সরাসরি নির্ধারিত ব্যাংক বা সরকারি হিসাবে জমা নেওয়া এবং প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে রসিদ দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছেন পাটওয়ারী। এতে হকারদের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বা অনিয়মের অভিযোগ জানাতে স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

তাঁর পরিকল্পনায় পুরো ঢাকায় একসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে কয়েকটি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে মডেলটি চালুর কথা বলা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কতজন হকার নিবন্ধিত হলেন, তাঁদের কতজন নির্ধারিত জায়গা পেলেন, পথচারীদের চলাচল কতটা স্বাভাবিক হলো, ব্যবসায়ীদের ওপর কী প্রভাব পড়ল এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে কী পরিবর্তন এলো—এসব বিষয় মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। সফল হলে ধাপে ধাপে পুরো নগরীতে এ মডেল সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।

পাটওয়ারীর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হকারদের শুধু এমন জায়গায় পুনর্বাসন করা যাবে না যেখানে তাঁদের কোনো ক্রেতা নেই। কারণ ক্রেতাহীন স্থানে দোকান বা ব্যবসার জায়গা বরাদ্দ দিলে কাগজে পুনর্বাসন হলেও বাস্তবে তা জীবিকা নিশ্চিত করবে না। আবার পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দিয়ে কোনো বিকল্প না রাখলেও তাঁরা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারেন।

ঢাকার ফুটপাত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে তাই পথচারী, হকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং নগর কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি সামনে এসেছে। ফুটপাতের প্রধান উদ্দেশ্য পথচারীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা ও মানবিকতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য হলো, ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগকে শুধু উচ্ছেদ অভিযান হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। চাঁদাবাজির অর্থনীতি বন্ধ, হকারদের নিবন্ধন, নির্ধারিত ব্যবসার স্থান, স্বচ্ছ ফি কাঠামো, ডিজিটাল তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা একসঙ্গে চালু করা গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ঢাকার ফুটপাত কার জন্য—এই প্রশ্নের উত্তর হতে হবে নগরবাসীর সামগ্রিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে। পথচারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি হকারদের জীবিকার পথও হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে উঠলে ফুটপাতের দখল ও চাঁদাবাজি কমানোর পাশাপাশি হাজারো মানুষের জীবিকাকেও নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব হতে পারে। এখন প্রস্তাবটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনেরা কীভাবে এতে যুক্ত হন, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com