চট্টগ্রাম বন্দরে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন কমছে ধারাবাহিকভাবে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৬ বার
চট্টগ্রাম বন্দরে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন কমছে ধারাবাহিকভাবে
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলওয়ের ভূমিকা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সড়কপথের যানজট কমানো, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য রেলপথকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু গত দুই অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। দুই বছরে এই পরিবহন কমেছে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সামগ্রিক পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় রেলওয়ের অংশও এখনো অত্যন্ত সীমিত।

বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলপথে ৮০ হাজার ৭১৯টি কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছিল। পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার ১০০টিতে। এক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার পরিবহন কমে ১৭ হাজার ৬১৯টি। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ওই অর্থবছরে রেলপথে পরিবহন করা হয় ৫৪ হাজার ৫৬৯টি কনটেইনার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ৫৩১টি কম।

সব মিলিয়ে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন কমেছে ২৬ হাজার ১৫০টি। শতকরা হিসাবে এই হ্রাসের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ দুই অর্থবছর আগের তুলনায় এখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলপথে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম কনটেইনার পরিবহন হচ্ছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ও ভবিষ্যৎ পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় এই প্রবণতা রেলওয়ের সক্ষমতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের মাত্র ২ শতাংশ রেলপথে সম্পন্ন হয়। মূলত বন্দরের ভেতর থেকে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন করা হয়। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তার তুলনায় রেলওয়ের অংশ খুবই ছোট। অথচ দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহন, সড়কের ওপর চাপ কমানো এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিকল্প তৈরি করার ক্ষেত্রে রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডিতে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন করা হয়। রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলের আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারকদের পণ্য ব্যবস্থাপনায় এই ডিপো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন্দরে আসা কনটেইনারের একটি অংশ রেলপথে ঢাকায় পৌঁছানোর ফলে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে কমলাপুর আইসিডির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও রেলভিত্তিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে কমলাপুর আইসিডিতে ৫৩ হাজার ৩৪৪ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৬২৭ টিইইউতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমেছে ১১ হাজার ৭১৭ টিইইউ, যা প্রায় ২২ শতাংশ। টিইইউ হলো ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেইনারের সমতুল্য পরিমাপের একক। সাধারণত ৪০ ফুটের একটি কনটেইনারকে দুই টিইইউ হিসেবে গণনা করা হয়। ফলে কনটেইনার পরিবহনের প্রকৃত পরিমাণ ও সক্ষমতা মূল্যায়নে এই একক গুরুত্বপূর্ণ।

রেলপথে কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনের চেষ্টা চলছে। প্রতিদিন ৬০০টির বেশি কনটেইনার পরিবহনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় সব পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর মতে, ইঞ্জিন ও লোকবলের সংকট দূর করা গেলে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। রেলসেবার মান উন্নয়নে বেশ কয়েকটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের ইঞ্জিন ও জনবলসংকট কেবল পরিবহনের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নয়, নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কনটেইনার পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি, পর্যাপ্ত মালবাহী ট্রেন, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন এবং দক্ষ জনবল দরকার। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য সময়মতো পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবহনমাধ্যমে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারেন। ফলে রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এদিকে দেশের লজিস্টিকস ব্যবস্থায় রেলপথের অংশ বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের লজিস্টিকস নীতিতে মোট পণ্য পরিবহনে রেলপথের অংশ বর্তমানের ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে দেশের পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিসংখ্যান ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগও প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে এই পরিকল্পনার গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ৯০ শতাংশ এই সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় সামান্য পরিবর্তনও দেশের সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে রেলওয়ের অংশ বাড়ানো গেলে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পণ্য সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থাও শক্তিশালী হতে পারে।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান ও নির্মাণাধীন টার্মিনালগুলোকে রেলপথের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘গ্রিন রেলওয়ে ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট প্রিপারেশন ফ্যাসিলিটি’ প্রকল্পের আওতায় বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালের সঙ্গে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মালবাহী রেল করিডোর উন্নয়ন এবং ফৌজদারহাট থেকে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড পর্যন্ত রেল যোগাযোগের উন্নয়ন নিয়েও সমীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। বাংলাদেশ রেলওয়ের গ্রিন রেলওয়ে পরিবহন প্রস্তুতিমূলক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ২১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পটির বয়স হয়েছে ১৮ মাস ২৮ দিন। এই সময়ে ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

প্রকল্পটির আওতায় ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে মাল্টিমোডাল পরিবহন হাব নির্মাণ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্রেইট করিডোর উন্নয়নের সমীক্ষা চলছে। কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনকেন্দ্রিক সমীক্ষার জন্য গত ১৪ সেপ্টেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্রেইট করিডোরের সমীক্ষার কাজ মাঠপর্যায়ে চলমান রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড পুনর্গঠন এবং ২০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

চলতি মাসে এসব কাজের অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট এবং ডিসেম্বরের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তির পর প্রকল্পের দুটি প্যাকেজের সম্ভাব্যতা যাচাই ও কনসেপচুয়াল ডিজাইনের জন্য পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। বাকি কাজও এগিয়ে চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণচুক্তির পর ১২ মাসের সময় বিবেচনায় প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক।

তবে পরিকল্পনা, সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পাশাপাশি বাস্তবে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু রেললাইন নির্মাণ বা টার্মিনাল সংযোগ স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না; পর্যাপ্ত ইঞ্জিন, মালবাহী ওয়াগন, জনবল, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং সময়ানুবর্তী সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানো ও গন্তব্যে পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই বন্দরের পণ্য পরিবহনব্যবস্থা যত বেশি কার্যকর ও বহুমুখী হবে, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য তত বেশি সুবিধা তৈরি হবে। রেলপথে কনটেইনার পরিবহন দুই বছরে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান তাই কেবল একটি পরিবহন খাতের সংকট নয়; এটি দেশের লজিস্টিকস ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০ শতাংশ পণ্য রেলপথে পরিবহনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই পরিবহনমাধ্যম দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com