দেশের চিনিশিল্পে নতুন উৎপাদন মৌসুমের সূচনা হতে যাচ্ছে। আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেডের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের আখ মাড়াই কার্যক্রম। চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ১১ হাজার ৭০০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মিল কর্তৃপক্ষ। আখ থেকে চিনি আহরণের হার বা রিকভারি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা, আখচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দেশের চিনিশিল্পে ইতিবাচক অগ্রগতি আনার প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মিল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মিলের কেইন ক্যারিয়ার প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এবারের মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামছুজ্জামান (সুরুজ)।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া এসব তথ্য জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মিল কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আখ সরবরাহ এবং মাড়াই প্রক্রিয়া সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলের এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা দেশের চিনিশিল্পের বর্তমান বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। ১ লাখ ৮০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ১১ হাজার ৭০০ টন চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে পুরো মৌসুমজুড়ে ধারাবাহিকভাবে আখ সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আখের মান, চিনির আহরণ হার এবং কারখানার যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতার ওপরও উৎপাদনের সাফল্য নির্ভর করবে।
চিনিকলের উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন অসংখ্য আখচাষি, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী এবং মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী। একটি মাড়াই মৌসুম শুরু হলে শুধু কারখানার ভেতরেই কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে না, আশপাশের কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসে। মাঠ থেকে আখ সংগ্রহ, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে পরিবহন, ওজন নির্ধারণ, মাড়াই এবং চিনি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
আখচাষিদের জন্য মাড়াই মৌসুম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করতে পারা তাঁদের কৃষি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়মতো আখ সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদিত ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং পরবর্তী কৃষি কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ হাতে আসে। অন্যদিকে, আখ সরবরাহে বিলম্ব, পরিবহনসংকট কিংবা মূল্য পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে কৃষকদের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। তাই মৌসুমজুড়ে আখচাষিদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা মিল কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এবারের মৌসুমে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ রিকভারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রিকভারি বলতে নির্দিষ্ট পরিমাণ আখ থেকে কত শতাংশ চিনি পাওয়া যাচ্ছে, সেই অনুপাতকে বোঝায়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টন আখ থেকে গড়ে ৬ দশমিক ৫০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রকৃত চিনি আহরণের হার আখের জাত, পরিপক্বতা, সতেজতা, আখের মধ্যে চিনির পরিমাণ এবং কারখানার প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
চিনির উৎপাদন বাড়াতে শুধু বেশি পরিমাণ আখ মাড়াই করাই যথেষ্ট নয়; আখের গুণগত মান বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি। মাঠ থেকে আখ কাটার পর যত দ্রুত সম্ভব চিনিকলে পৌঁছানো গেলে আখের মধ্যে থাকা চিনির পরিমাণ সংরক্ষণে সহায়তা পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় কাটা অবস্থায় পড়ে থাকলে আখের গুণগত মান কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়ে চিনি আহরণের হারে। এ কারণে আখ কাটার সময়সূচি, পরিবহনব্যবস্থা এবং মিলের মাড়াই সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
দেশের চিনিশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামাল সংগ্রহ, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা এবং বাজারে চিনির প্রতিযোগিতা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে মানসম্মত চিনি উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা—দুই বিষয়ই চিনিকলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় চিনিকলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য উৎপাদন পরিকল্পনার পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলসের এবারের মাড়াই মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে স্থানীয় আখচাষিদের জন্যও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত আখ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে কৃষকেরা আখ চাষে আগ্রহী হতে পারেন। পাশাপাশি কারখানাকেন্দ্রিক পরিবহন, শ্রম ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব সুফল নিশ্চিত করতে কৃষকদের কাছ থেকে সময়মতো আখ সংগ্রহ, স্বচ্ছ ওজন নির্ধারণ এবং সরবরাহ করা আখের মূল্য যথাসময়ে পরিশোধ করা প্রয়োজন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যানের উপস্থিতি এবারের মাড়াই মৌসুমের গুরুত্বকে তুলে ধরছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উৎপাদন পরিকল্পনা, কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বাইরেও পুরো মৌসুমে উৎপাদন কার্যক্রম কতটা নির্বিঘ্নে পরিচালিত হয়, সেটিই হবে মিল কর্তৃপক্ষের জন্য বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২০২৭ মৌসুমে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলসের ১ লাখ ৮০ হাজার টন আখ মাড়াই এবং ১১ হাজার ৭০০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে। নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি আখচাষিদের স্বার্থ রক্ষা, কারখানার সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে এ মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলসের এবারের মাড়াই মৌসুম দেশের চিনিশিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত