বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনপ্রেমীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড এবং ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রের প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এই অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ছয় দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে হলিউডসহ আন্তর্জাতিক বিনোদনজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। বৃহস্পতিবার তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আলঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে স্ত্রী সানি ওজেল তাঁর পাশে ছিলেন। পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সান্নিধ্যে, সংগীত, প্রার্থনা, হাসি-কান্না এবং ভালোবাসার আবহে কেটেছে তাঁর শেষ দিনগুলো।
পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র। গভীর কণ্ঠস্বর, সংযত অভিব্যক্তি, ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিনয় এবং সংলাপ বলার বিশেষ ভঙ্গি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। কখনো মহাকাশযানের দায়িত্বশীল অধিনায়ক, কখনো অতিমানবদের শিক্ষক, আবার কখনো শেক্সপিয়ারের নাটকের জটিল চরিত্র—বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। তাঁর অভিনয়ের ব্যাপ্তি শুধু জনপ্রিয় বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; মঞ্চনাটকে তাঁর দক্ষতা তাঁকে সমালোচক ও দর্শক—উভয়ের কাছেই সম্মানিত করেছে।
১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশব খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক তাঁর কল্পনা ও শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি যুক্ত হন ব্রিটেনের মর্যাদাপূর্ণ রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিতে। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করে মঞ্চাভিনেতা হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
শেক্সপিয়ারের নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত পরিচিতি তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক খ্যাতি আসে জীবনের তুলনামূলক পরিণত বয়সে। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ ধারাবাহিকে ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। তখন তাঁর বয়স ৪৭ বছর। মহাকাশযান ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের অধিনায়ক হিসেবে পিকার্ডের চরিত্রে তাঁর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও বিচক্ষণতার প্রকাশ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ধারাবাহিকটি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সাতটি মৌসুমে প্রচারিত হয়। এর মাধ্যমে প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। চরিত্রটির জনপ্রিয়তা এতটাই বিস্তৃত হয় যে পরবর্তী সময়েও তাঁকে একাধিক ‘স্টার ট্রেক’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালে শুরু হওয়া ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজেও তিনি আবার সেই পরিচিত চরিত্রে ফিরে আসেন। বয়স বাড়লেও চরিত্রটির প্রতি তাঁর অভিনয়দক্ষতা ও দর্শকদের আগ্রহ যে কমেনি, সেই প্রত্যাবর্তন তারই প্রমাণ।
নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আরেকটি জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে নির্মিত এই কাহিনিতে জেভিয়ার ছিলেন একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর চরিত্রে প্রজ্ঞা, সহমর্মিতা এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থানের বার্তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন স্টুয়ার্ট।
‘এক্স-মেন’ সিরিজের একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লোগান’ ছবিতেও প্রফেসর জেভিয়ার চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এই ছবিতে চরিত্রটির বয়স, দুর্বলতা ও মানবিক সংকটকে তিনি ভিন্ন মাত্রায় তুলে ধরেন। মার্ভেলের আসন্ন ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয়ের কথা জানা গেছে। ফলে মৃত্যুর খবরের মধ্যেও দর্শকদের কাছে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মঞ্চাভিনেতা হিসেবে প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের অর্জনও ছিল উল্লেখযোগ্য। রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিতে কাজ করার পাশাপাশি ব্রিটেনের বিভিন্ন মঞ্চ ও ব্রডওয়েতে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘হ্যামলেট’, ‘দ্য টেম্পেস্ট’সহ শেক্সপিয়ারের বিভিন্ন নাটকে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের তারকা হয়েও মঞ্চের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন তিনি। অভিনয়ের প্রতি এই নিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকেই তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় ‘স্যার’।
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মৃত্যুতে তাঁর সহশিল্পী ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ‘স্টার ট্রেক’-এর অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার তাঁকে প্রজ্ঞা, সৌজন্য ও মানবিক গুণাবলির জন্য স্মরণ করেছেন। ‘এক্স-মেন’ সিরিজে তাঁর সহশিল্পী হিউ জ্যাকম্যানও শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে মঞ্চ ও পর্দার অন্যতম অসাধারণ অভিনয়শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মার্ভেল স্টুডিওসের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে স্টুয়ার্টের অভিনয়প্রতিভা, সহকর্মীদের প্রতি উদারতা এবং প্রফেসর জেভিয়ার চরিত্রকে স্মরণীয় করে তোলার অবদানের কথা উঠে এসেছে।
অভিনয়ের বাইরেও সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। মানবাধিকার, পারিবারিক সহিংসতার শিকার মানুষ, শরণার্থী, প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাণিকল্যাণের মতো বিষয়ে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। নিজের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাকে তিনি বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে ব্যবহার করেছেন। এ কারণে তাঁকে শুধু একজন সফল অভিনেতা হিসেবেই নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণ করছেন অনেকে।
ব্যক্তিজীবনে প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের স্ত্রী সানি ওজেল এবং আগের সংসারের দুই সন্তান ড্যানিয়েল ও সোফি রয়েছেন। তাঁর পরিবারের জন্য এই মৃত্যু এক গভীর ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শকদের কাছেও এটি এক প্রিয় শিল্পীকে হারানোর বেদনা।
একজন অভিনেতার দীর্ঘ কর্মজীবন কখনো কখনো তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। শেক্সপিয়ারের মঞ্চ থেকে মহাকাশযানের অধিনায়ক, কিংবা অতিমানবদের শিক্ষক—প্রতিটি চরিত্রে তিনি অভিনয়ের আলাদা ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের সংযত শক্তি দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে রাখবে। পর্দার আলো নিভে গেলেও তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ও শিল্পীসত্তা বিশ্ব বিনোদনজগতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত