এমবাপ্পেকে ২৮ পয়েন্টে হারিয়ে ব্যালন ডি’অর কেইনের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার
এমবাপ্পেকে ২৮ পয়েন্টে হারিয়ে ব্যালন ডি’অর কেইনের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডের ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়েছেন হ্যারি কেইন। ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জিতে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্বীকৃতি অর্জন করেছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। তবে তাঁর এই জয় মোটেও সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে সোনালি ট্রফি নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ভোটের ফল প্রকাশের পর স্পষ্ট হয়েছে, এবারের পুরুষদের বিভাগে শীর্ষ দুই ফুটবলারের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অত্যন্ত তীব্র।

গত ২৬ অক্টোবর ফ্রান্সের বাইরে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অরের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। প্যালাডিয়াম থিয়েটারে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন ছিল পুরস্কারটির ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫৬ সালে ব্যালন ডি’অর চালুর পর প্রথম বিজয়ী ছিলেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতেই এবার লন্ডনকে অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। আর সেই ঐতিহাসিক আয়োজনেই ম্যাথিউসের দেশ ইংল্যান্ডকে আবারও গৌরব এনে দেন কেইন।

২০০১ সালে লিভারপুলের হয়ে খেলা মাইকেল ওয়েন সর্বশেষ ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর কোনো ইংলিশ খেলোয়াড়ের হাতে ওঠেনি এই সম্মানজনক পুরস্কার। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডের পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন কেইন। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ইংলিশ ফুটবলের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

ভোটের হিসাবে কেইন পেয়েছেন ১ হাজার ৫৫ পয়েন্ট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এমবাপ্পের সংগ্রহ ১ হাজার ২৭ পয়েন্ট। অর্থাৎ দুই তারকার মধ্যে ব্যবধান মাত্র ২৮ পয়েন্ট। ব্যালন ডি’অরের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি চতুর্থ নিকটতম ভোটের লড়াই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলাফল থেকে বোঝা যায়, শেষ পর্যন্ত কেইন এগিয়ে থাকলেও এমবাপ্পের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল প্রায় সমানে সমান।

এবারের ভোটে প্রথম স্থানের পছন্দ হিসেবেও এগিয়ে ছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ১০০ জন সাংবাদিকের ভোটে কেইন ৪০টি প্রথম স্থানের ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে এমবাপ্পের পক্ষে প্রথম স্থানের ভোট পড়েছে ২৩টি। এই ব্যবধান কেইনের জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও মোট পয়েন্টের হিসাবে দুই তারকার পার্থক্য ছিল সামান্য, প্রথম স্থানের ভোটে কেইনের এগিয়ে থাকা তাঁর পারফরম্যান্সের প্রতি সাংবাদিকদের সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

কেইনের এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে দুর্দান্ত গোল করার ধারাবাহিকতা। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা ছিল ৭৩। ইউরোপের শীর্ষ গোলদাতা হিসেবেও মৌসুম শেষ করেন তিনি। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এই স্ট্রাইকার। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে ছয়টি গোল করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা ও দলীয় পর্যায়ে অবদান ব্যালন ডি’অরের ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এমবাপ্পের পারফরম্যান্সও ছিল উল্লেখযোগ্য। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে ৪২টি গোল করেছেন ফরাসি তারকা। জাতীয় দলের হয়েও তাঁর সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে ২২টি গোল করে আসরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। এতসব সাফল্যের পরও কেইনের কাছে অল্প ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দুই তারকার গোলসংখ্যা, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবদান নিয়ে এবারের ভোটে যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, ফলাফলেই তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

শীর্ষ দুইয়ের লড়াই থেকে কিছুটা দূরে ছিলেন স্পেনের তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে খেলা এই তারকা ৮৮১ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন। প্রথম স্থানের ভোট পেয়েছেন ১৩টি। তরুণ বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন ইয়ামাল। তাঁর পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা এবং বড় ম্যাচে প্রভাব রাখার ক্ষমতা তাঁকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী করে তুলেছে। তবে কেইন ও এমবাপ্পের সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধান এবার বেশ বড় ছিল।

চতুর্থ স্থানে থাকা রদ্রির সংগ্রহ ৭২৬ পয়েন্ট। তিনি পেয়েছেন ১০টি প্রথম স্থানের ভোট। শীর্ষ চারজনের মধ্যে পয়েন্টের পার্থক্য এবারের ভোটের প্রতিযোগিতার বিভিন্ন মাত্রা তুলে ধরেছে। পঞ্চম স্থানে রয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা লিওনেল মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলা এই ফুটবলারের পয়েন্ট ৬১২। বয়স ও ক্যারিয়ারের পর্যায় বিবেচনায় তাঁর অবস্থানও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

ষষ্ঠ স্থানে জর্জিয়ার খিচা কাভেরেইস্কা পেয়েছেন ৫৪১ পয়েন্ট। সপ্তম হয়েছেন ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে, তাঁর সংগ্রহ ৪১৮ পয়েন্ট। নরওয়ের আর্লিং হালান্ড ৩৭৮ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছেন। নবম হয়েছেন ফ্রান্সের মাইকেল ওলিসে, যিনি পেয়েছেন ২৯৬ পয়েন্ট। আর দশম স্থানে থাকা স্পেনের ফ্যাবিয়ান রুইজের পয়েন্ট ২০১। এই ফলাফল দেখিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাব ও জাতীয় দলের একাধিক তারকা এবারের পুরস্কারের দৌড়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

নারীদের বিভাগেও ছিল উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে পুরুষদের তুলনায় সেখানে শীর্ষস্থান নির্ধারণের লড়াই কিছুটা কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। স্পেনের আলেক্সিয়া পুতেয়াস ৬১৮ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নারী ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এওয়া পায়োর পেয়েছেন ৫৩২ পয়েন্ট। তাঁদের মধ্যে ব্যবধান ৮৬। ম্যানচেস্টার সিটির খাদিজা শ ৩৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন। নারীদের ফুটবলে পুতেয়াসের এই সাফল্য তাঁর দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা ও ব্যক্তিগত দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যালন ডি’অর ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স, ধারাবাহিকতা, দলীয় অবদান এবং মাঠে তাঁর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সাংবাদিকদের ভোটে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। তাই এই পুরস্কার শুধু গোলসংখ্যার হিসাব নয়; একজন ফুটবলার পুরো মৌসুমে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেইনের ক্ষেত্রে গোল করার ধারাবাহিকতা, বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে পারফরম্যান্স এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে অবদান তাঁকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে দিয়েছে।

কেইনের এই জয় ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যক্তিগত স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা ইংলিশ সমর্থকদের জন্য এটি বিশেষ আনন্দের খবর। অন্যদিকে মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে এমবাপ্পের পিছিয়ে পড়া প্রমাণ করেছে, এবারের পুরস্কারের লড়াই কতটা কঠিন ছিল। ইয়ামাল, রদ্রি, মেসি ও অন্য তারকাদের অবস্থানও ফুটবল বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর শুধু কেইনের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ফুটবলের দুই প্রজন্মের তারকা এবং বিভিন্ন দেশের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com