ভারত-চীনের কূটনৈতিক উত্তরণ: বিরল খনিজ রপ্তানি শিথিল, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বড় ধাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ আগস্ট, ২০২৫
  • ৪৯ বার

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে বড় অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। চীন এবার ভারতের কাছে বিরল খনিজ রপ্তানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে চীনের আগে ভারতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রতিরক্ষা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পসহ ভারতের উচ্চপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সোমবার সন্ধ্যায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মধ্যে বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বৈঠকে ভারতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়—সারের সরবরাহ, বিরল চৌম্বক খনিজ ও টানেল-বোরিং মেশিনের জোগান—নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়। এই তিনটি খাত ভারতের কৃষি, হাই-টেক শিল্প এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, আগের বছর চীনের আকস্মিক সার রপ্তানি-নিষেধাজ্ঞার ফলে রবি মৌসুমে ডি-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের সরবরাহে বড় প্রভাব পড়েছিল। এছাড়া টানেল-বোরিং মেশিনের চালান আটকে যাওয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছিল। অটো ও ইলেকট্রনিক শিল্পও চীনের বিরল চৌম্বক খনিজ রপ্তানি বন্ধে মারাত্মক প্রভাবের আশঙ্কা দেখেছিল। মূলত সীমান্ত উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তি দেখিয়ে বেইজিং এসব নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চীন ও ভারত বিভিন্ন পর্যায়ে আস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এস জয়শঙ্কর ও ওয়াং ইর গত মাসে দু’টি বৈঠকও করেছেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা শিথিল করার এই সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে, তখন এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ওয়াশিংটন ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে শিথিল নীতি গ্রহণ করেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যবিরতি নবায়ন করা হয়েছে, শুল্ক আরোপ ৯০ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং উচ্চপ্রযুক্তির চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে অগ্রগতি হয়েছে।

বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ উপাদানগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাশিল্পের জন্য অপরিহার্য। মুঠোফোন, কম্পিউটার চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন, স্যাটেলাইট, ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগুলোর ব্যবহার অপরিসীম। বিশ্বের এই খনিজ উৎপাদন ও রপ্তানির ৬০–৭০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। শুধু উৎপাদন নয়, প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলেও চীনের একাধিপত্য রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিরল খনিজকে ‘২১ শতকের তেল’ বলা হয়। এর কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বহু দেশের শিল্পোন্নয়নে এই উপাদানগুলোর উপর চীনের প্রভাব অপরিসীম। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের সময়ও বেইজিং এই খনিজের রপ্তানি সীমিত করেছিল। ২০১০ সালে জাপানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সময়ও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল।

ভারতের অটো ও ইলেকট্রনিক শিল্পের জন্য এই খনিজ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীনের শিথিল সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক আস্থার দিক থেকেও বড় বার্তা বহন করছে। এই পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃঢ়ীকরণ এবং শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত