দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন ম্যাপ-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১১২ বার
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন ম্যাপ-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ‘ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

চলতি দশকের মধ্যে বিশ্বরাজনীতির ছন্দ বদলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-র বিদেশনীতি ও কূটনৈতিক জোরশক্তির মানচিত্রও পরিবর্তনের পথে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলীর পরে ঢাকা-পাকিস্তান-তুরস্ক-চীন গতিশীলতাকে কেন্দ্র করে যে ঘনিষ্ঠতা দেখা দিয়েছে তা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও বাণিজ্যিক ও সামরিক কৌশলের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

গত একবছর ধরে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর, বাণিজ্যিক জাহাজের সরাসরি চলাচল এবং প্রতিনিধি পর্যায়ে বেড়েই চলা বিনিময় এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব ও পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর, পাশাপাশি ঢাকা-কারচুয়া বাণিজ্যিক যোগাযোগের সম্প্রসারণ—এসব ঘটনাই দুই দেশের মধ্যে এক ধারাবাহিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কও অর্থনৈতিক ও সামরিক মঞ্চে গত কয়েক বছরে প্রসৃত হয়েছে; চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে কাজ করে এসেছে, আর তুরস্ক সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ক্রমেই উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।

এই পুনরায় ঘনিষ্ঠতার পেছনে ইতিহাসের স্মৃতি ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। ঢাকায় পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের সফরের সময় ১৯৭১ সংশ্লিষ্ট ইস্যু যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, তা দেখায় ঐতিহাসিক ব্যথা এখনো কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও প্রবেশ করে। এ ইস্যু দুটি দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রাখে এবং কখনও কখনও সফরগুলোকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

অর্থনীতিকভাবে বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজার ও বর্ধিত উৎপাদনশীলতা যেকোনো বহিঃশক্তির জন্যই আকর্ষণীয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীন—তিন দেশেরই লক্ষ্য বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক ও লগিস্টিক্যালভাবে সংযুক্ত করে তাদের বাজার সম্প্রসারণ করা। সরাসরি চালান, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উদ্যোগে অংশগ্রহণ যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবু বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে কাস্টমস, বিনিয়োগ সংরক্ষণ ও স্থানীয় শিল্প-নীতির সমন্বয় অপরিহার্য; নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা থাকলে সম্ভাব্য সুবিধা কমে যেতে পারে বা নির্ভরশীলতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

সামরিক ও কৌশলগত মঞ্চে তুরস্ক-চীন-পাকিস্তান তিনকোণের সম্ভাব্য সংশ্লেষ বাংলাদেশকে নতুন ক্ষমতা ও ঝুঁকি—উভয়ই দিচ্ছে। তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষত নিরonatoভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ড্রোন প্রযুক্তি, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। চীন দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সহায়তা দিয়ে আসছে; পাকিস্তান-চীন-তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোর হলে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে জ্যামিতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা যেতে পারে। তবে এই ঘনিষ্ঠতা যদি একপাক্ষিক বা শক্তিধর দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করে, তবে তা আঞ্চলিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং প্রতিবেশী শক্তির প্রতিক্রিয়া উদ্রেক করতে পারে।

ভারতের ভূ-রাজনৈতিক উপস্থিতি ও প্রভাবকে এ পর্যায়ে উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাাদেশ যদি পাকিস্তান-তুরস্ক-চীন বিরূপ সমন্বয়ে বেশি নড়ে আসে, তা ভারতীয় নীতিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন ফ্রিকশন ডেকে আনতে পারে—যা কেবল কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; বাণিজ্যিক, সীমান্ত-নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণেই ঢাকা অনেকাংশে বহুমাত্রিক নীতি গ্রহণে আগ্রহী; কোনো এক শক্তির সঙ্গে অস্থিরভাবে জড়িয়ে পড়ার বদলে স্বার্থনিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার দিকে পরিচালিত করবে—এর পরামর্শই কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের থেকে বারবার শোনা যাচ্ছে।

নীতিনির্ধারক স্তরে বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ ও এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তিগত স্থানান্তর ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—কিন্তু সেটি মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় রেখে করা উচিত। বিদেশি ঋণ, প্রকল্প নির্ভরশীলতা ও কৌশলগত আনুগত্য—এসব ঝুঁকি সচেতনভাবে ম্যানেজ না করলে অগ্রগতির পাশাপাশি অসামঞ্জস্য ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও শক্ত হতে পারে।

অঞ্চলের পর্যবেক্ষকরা দেখেন, পাকিস্তান-তুরস্ক-চীনকে একত্রিত করে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি কার্যকরী বলয় তৈরি করা সহজ কাজ নয়; এটি সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন কৌশলগত স্বার্থের সামঞ্জস্য, বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ও প্রতিবেশী শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার সুচিন্তন। ঢাকার কাজ হবে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষা করা, বহুপক্ষীয় কূটনীতি বজায় রাখা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

সংক্ষেপে, বর্তমানে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—দুইই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বুদ্ধিমত্তা ও স্বার্থনিরপেক্ষ কূটনীতি অনুসরণ করলে নতুন কৌশলগত সম্পর্কগুলো দেশের জন্য বড় সুবিধা বয়ে আনতে পারে; অন্যদিকে অসচেতন একপক্ষীয় নির্ভরতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ঢাকার সামনে এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও মাপসই কূটনৈতিক সমন্বয়ের বাস্তব প্রয়োগই প্রধান চাবিকাঠি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত