প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইরানে নবী মুসা (আ.)-এর জীবন ও সংগ্রাম অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মুসা কালিমুল্লাহ: অ্যাট ডন (Moses the Kalimullah: At Dawn)’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি চলচ্চিত্রটি দেখে প্রশংসা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি। শুধু প্রশংসা নয়, তিনি এ প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য নির্মাতাদের প্রতি নির্দেশও দিয়েছেন। ফলে ইরানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধর্মীয় ঐতিহাসিক কাহিনি নিয়ে নির্মাণের যে ধারা রয়েছে, তা আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেহরানে চলচ্চিত্রটির প্রযোজক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক বৈঠকে খামেনি বলেন, “আমি মুসা (আ.)-এর চলচ্চিত্রটি দেখেছি, অসাধারণ ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, এটি খুবই উৎকৃষ্ট একটি কাজ হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আপনারা একইভাবে এর পরবর্তী অংশও নির্মাণ করতে পারবেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমি চলচ্চিত্রটি দেখে যেমন উপভোগ করেছি, তেমনি এমন একটি কাজ তৈরি হওয়ায় আনন্দিতও হয়েছি।” তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইরানের ভেতরে বাইরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
চলচ্চিত্রটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন ইরানের খ্যাতনামা পরিচালক এনায়েতুল্লাহ হাতামিকিয়া। তিনি ইরানে যুদ্ধভিত্তিক ও দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সুপরিচিত। তবে মুসা (আ.)-এর জীবন ও তার আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্বের কাহিনি নিয়ে এই সিনেমাটিকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখছেন।
‘মুসা কালিমুল্লাহ: অ্যাট ডন’-এর গল্প শুরু হয় ফেরাউনের ভয়ঙ্কর এক স্বপ্ন দিয়ে। স্বপ্নে তিনি দেখেন, এক ধ্বংসাত্মক শক্তি তার রাজত্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে। রাজদরবারের পুরোহিত আনুবিস স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন এবং ঘোষণা করেন যে একটি শিশু জন্ম নিতে যাচ্ছে, যে ফেরাউনের সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। ভীত ফেরাউন শিশু হত্যার নির্দেশ দেন। এই সময়েই জন্ম নেন নবী মুসা (আ.)। এখান থেকেই গল্পের ধারা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এতে ফুটে ওঠে তার শৈশব, ফেরাউনের দরবারে বেড়ে ওঠা, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহি এবং অবশেষে ফেরাউনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
সিনেমাটিতে ধর্মীয় ইতিহাসকে যতটা সম্ভব নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্মাতারা। ইসলামী ঐতিহ্য ও কুরআনের বর্ণনা অনুসরণ করেই চলচ্চিত্রের কাহিনি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আধুনিক সিনেমাটিক প্রযুক্তি, ভিজ্যুয়াল এফেক্ট ও সুপরিকল্পিত সেট ডিজাইনের মাধ্যমে গল্পকে দর্শকের কাছে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতি ও শিল্পকলাকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে আসছেন। তার মতে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষের মনে নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। মুসা (আ.)-কে নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রকে তিনি ইসলামী ঐতিহ্য প্রচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খামেনির প্রশংসার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে সিনেমাটি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে লিখেছেন, এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষার পুনরুজ্জীবন।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আলোচনার ঝড় উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা, রয়টার্স ও বিবিসি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কয়েকটি ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষও চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মহলে ছবিটি নিয়ে আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
তবে সমালোচনারও অভাব নেই। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ফেরাউনের প্রতীকী উপস্থাপনা এবং শক্তিশালী শাসকের পতনের কাহিনি বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করতে পারে। যদিও পরিচালক হাতামিকিয়া বলেছেন, “এটি কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্য নয়, বরং কেবল ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে মুসা (আ.)-এর জীবনকাহিনি তুলে ধরা।”
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া The Kingdom of Solomon এবং টেলিভিশন সিরিজ আকারে নির্মিত Prophet Joseph (Yusuf A.S.) সারা বিশ্বেই মুসলিম দর্শকদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ‘মুসা কালিমুল্লাহ’ আরও বৃহৎ পরিসরের একটি উদ্যোগ।
প্রযোজকরা জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক প্রকল্প। ভবিষ্যতে এ গল্পের ওপর ভিত্তি করে টেলিভিশন সিরিজ, শিশুদের জন্য সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এবং শিক্ষামূলক প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নবী মুসা (আ.)-এর জীবনকাহিনি নতুন প্রজন্মের কাছে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
মুসা (আ.) ইসলামী ইতিহাসে একজন মহাপুরুষ, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তার কাহিনি কেবল ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং মানবতার জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। ইরানে নির্মিত ‘মুসা কালিমুল্লাহ’ সেই শিক্ষা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার এক নতুন প্রচেষ্টা।
আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রশংসা চলচ্চিত্রটির গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, ধর্মীয় ইতিহাসভিত্তিক বড় বাজেটের চলচ্চিত্রও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ ইসলামী সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে আরও জোরদার করবে।
চলচ্চিত্রটি শিগগিরই আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মুসলিম সমাজের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও এর মাধ্যমে নবী মুসা (আ.)-এর কাহিনি নতুনভাবে জানার সুযোগ পাবেন। ফলে এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।