লিবিয়ার উপকূলে নৌকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, অন্তত ৫০ সুদানি শরণার্থীর মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
লিবিয়ার উপকূলে নৌকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, অন্তত ৫০ সুদানি শরণার্থীর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার উপকূলে সুদানি শরণার্থীবাহী একটি নৌকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোররাতে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় নৌকাটিতে থাকা ৭৫ জন শরণার্থীর মধ্যে মাত্র ২৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) নিশ্চিত করেছে।

আইওএম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উদ্ধারকৃতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক পোস্টে জানিয়েছে, সমুদ্রপথে শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে এবং তা ঠেকাতে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আইওএম সতর্ক করেছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসন বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, দুর্ঘটনার সময় নৌকাটিতে থাকা শরণার্থীরা মূলত সুদান থেকে পালিয়ে আসা মানুষ। চলমান গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত থেকে বাঁচতে তারা ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে যাত্রাপথেই ঘটে গেল এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নৌকাটিতে অতিরিক্ত যাত্রী থাকার কারণে এবং অগ্নিকাণ্ডের পর যথাযথ উদ্ধার ব্যবস্থা না থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

এই ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে দুটি নৌকা ডুবে অন্তত ২৭ জন শরণার্থী প্রাণ হারান। আবার জুন মাসে লিবিয়ার উপকূলে দুটি পৃথক জাহাজডুবিতে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে এ বছরের প্রথম আট মাসেই ভূমধ্যসাগরে শত শত প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে আইওএম। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালে একাই অন্তত ২ হাজার ৪৫২ জন অভিবাসী ও শরণার্থী ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছিলেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিবিয়া আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানো অভিবাসীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দেশটি রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিতিশীলতায় জর্জরিত। এর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী মানবপাচার, অস্ত্র ও অর্থ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। ফলে আফ্রিকার বহু দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা মানুষ ইউরোপমুখী হতে গিয়ে লিবিয়ায় আটকা পড়ে, অথবা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সমুদ্রপথে যাত্রা করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, লিবিয়ায় আটক অভিবাসী ও শরণার্থীরা ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। তাদের ওপর নিয়মিতভাবে নির্যাতন, ধর্ষণ, অর্থ আদায়, এবং জোরপূর্বক শ্রমদানের অভিযোগ উঠেছে। অনেককে জিম্মি করে রাখা হয় এবং তাদের পরিবার থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মতে, এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় কিছু মিলিশিয়া গোষ্ঠী সরাসরি জড়িত এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের সঙ্গে লিবিয়ার সরকারি কোস্টগার্ডের যোগসাজশের অভিযোগও বারবার উঠছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসন ঠেকাতে লিবিয়ার কোস্টগার্ডকে সরঞ্জাম ও অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং সরকারি উদ্ধার অভিযান কমিয়ে দেওয়ায় ও বেসরকারি এনজিওগুলোর সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কার্যক্রম সীমিত করায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ইউরোপে পৌঁছাতে না পেরে লিবিয়ায় অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অথবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ এই অভিবাসন সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সুদানে সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে চলমান সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেকেই প্রতিবেশী দেশ কিংবা লিবিয়ার উপকূল হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নের যাত্রা প্রায়ই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

লিবিয়ার সর্বশেষ এ দুর্ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, প্রতিটি প্রাণহানি মানবজাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সমুদ্রপথে শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ নিশ্চিত করতে না পারলে এমন মৃত্যুমিছিল অব্যাহত থাকবে।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন জানান, যাত্রার শুরু থেকেই নৌকাটি ছিল অতিরিক্ত ভরা এবং খারাপ অবস্থায়। যাত্রাপথে ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়ই নৌকায় আগুন ধরে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে পুরো নৌকা। অনেকেই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু বেশিরভাগই সাঁতার জানতেন না। যারা সাঁতরে কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাদের অনেকে এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ভুগছেন।

বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়। অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা, পাচারচক্র দমন এবং লিবিয়ার মতো অস্থিতিশীল দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করার বিকল্প নেই।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শরণার্থীরা কেবল পরিসংখ্যান নয়—তারা প্রত্যেকেই একেকজন মানুষ, যাদের স্বপ্ন, পরিবার এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা আছে। দুঃখজনকভাবে ইউরোপের তীরে পৌঁছানোর স্বপ্ন তাদের অনেকের জন্যই মৃত্যুর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরের গভীরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত