প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের জনপ্রিয় টকশো হোস্ট জিমি কিমেলকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘটনার পর ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, যারা তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাবে, তাদের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। ঘটনাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সূত্রপাত হয়েছে এবিসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ডিজনির মালিকানাধীন এই টেলিভিশন চ্যানেল গত বুধবার ঘোষণা করে, কিমেলের অনুষ্ঠান জিমি কিমেল লাইভ! অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হবে। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, কিমেল সম্প্রতি নিহত রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্ককে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবারের এক সম্প্রচার থেকে। সেদিন কিমেল দাবি করেন, কার্ক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন “মাগা রিপাবলিকান”—অর্থাৎ ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু উটাহ কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষে জানায়, হামলাকারী আসলে এক “বামপন্থি মতাদর্শে প্রভাবিত” ব্যক্তি। এ তথ্য প্রকাশের পর কিমেলের বক্তব্যকে বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর আখ্যা দেওয়া হয়। মার্কিন সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফসিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, এই ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলস্বরূপ, এবিসি কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য সফর শেষে দেশে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমি পড়েছি, প্রায় ৯৭ শতাংশ নেটওয়ার্ক আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। তবু আমি জিতেছি, সব সুইং স্টেট জিতেছি। তারা আমাকে নিয়ে শুধু নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে। অথচ তারা লাইসেন্স পায়। হয়তো তাদের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া উচিত।” তার এই বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে আবারও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কিমেল অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি অভিযোগ করেছেন, “মাগা গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে হত্যাকারীকে অন্য কারও মতো দেখাতে। তারা বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে।” ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যঙ্গ করে কিমেল বলেন, “ওটা যেন চার বছরের শিশু সোনালি মাছ মারা যাওয়ার পর যেভাবে শোক প্রকাশ করে।” তবে তিনি পরে ইনস্টাগ্রামে কার্ক পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কিমেলের বরখাস্ত হওয়া “শেষ পদক্ষেপ নয়।” তিনি বলেন, “আমরা সম্প্রচারকদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখব। যদি তারা নিয়ম মেনে না চলে, তবে তাদের লাইসেন্স ফিরিয়ে দিতে হতে পারে।” এই বক্তব্যে অনেকেই ধারণা করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এখন সরাসরি এফসিসির কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের হুমকিকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দিয়েছে। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে কোনো সম্প্রচার সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করা হলে তা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল হবে। এছাড়া এফসিসির এখতিয়ারও সীমিত। তারা মূলত ফ্রি-টু-এয়ার নেটওয়ার্ক, যেমন এবিসি ও এর সহযোগী স্টেশনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। কেবল টিভি, পডকাস্ট কিংবা অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। ফলে লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।
এদিকে এবিসির সহযোগী নেটওয়ার্ক সিনক্লেয়ার জানিয়েছে, কিমেলের নির্ধারিত সম্প্রচার সময়েই শুক্রবার রাতে তারা নিহত কর্মী চার্লি কার্ককে স্মরণে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে। এবিসির এমন পদক্ষেপ অনেকের কাছে “নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা” হিসেবে প্রতীয়মান হলেও সমালোচকরা বলছেন, এটি আসলে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারেরই উদাহরণ।
এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন। মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ প্রসঙ্গে লিখেছে, ট্রাম্পের বক্তব্য আসলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি কৌশলের অংশ হতে পারে। অপরদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকরা বলছেন, মূলধারার সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই পক্ষপাতদুষ্ট এবং রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অযৌক্তিক নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের প্রভাব শুধু গণমাধ্যম নয়, বরং মার্কিন রাজনীতিতেও পড়বে। এবিসির মতো বৃহৎ নেটওয়ার্কে জনপ্রিয় উপস্থাপকের বরখাস্ত হওয়া একদিকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার প্রভাবকে প্রকাশ করে, অন্যদিকে মিডিয়ার স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্ট করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে এমন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, গণতান্ত্রিক দেশের নেতার কাছ থেকে এই ধরনের বক্তব্য হতাশাজনক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হলে তা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে এবিসি নেটওয়ার্কের এই বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য ও এফসিসির অবস্থান প্রমাণ করছে, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক আরও তিক্ত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গণমাধ্যম কি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে, নাকি সংবিধানপ্রদত্ত স্বাধীনতার জোরে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে? এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও মুক্ত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ।