কুমার নদে নৌকাবাইচ উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
কুমার নদে নৌকাবাইচ উৎসব: গ্রামীণ ঐতিহ্যের রঙে রঙিন হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান আনন্দ উৎসব নৌকাবাইচ আবারও প্রাণ ফিরে পেল গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হোগলাকান্দি গ্রামে। কুমার নদকে ঘিরে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি ক্রীড়া আসরই নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক আবেগের প্রকাশ হয়ে উঠেছে। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের ঢল প্রমাণ করেছে, এ দেশের মানুষ এখনো তাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত এবং ঐতিহ্যের টানে সমবেত হতে ভোলেনি।

আয়োজক ছিল হোগলাকান্দি গ্রামের তরুণ সমাজ। তাদের উদ্যোগে নদীর বুকে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশ নেয় মোট ছয়টি শক্তিশালী নৌকা। বৈঠার দোল আর ঢেউ কেটে এগিয়ে চলা নৌকাগুলোর গতি, নদীর বুকে প্রতিযোগিতার উত্তেজনা এবং দর্শকদের উল্লাস মিলে কুমার নদ পরিণত হয় উৎসবের রঙিন আবহে। প্রতিযোগিতার ফলাফলে ‘যুব এক্সপ্রেস’ নৌকা প্রথম স্থান অর্জন করে, যা দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাসে প্রতিধ্বনিত হয়।

দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোর থেকে নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমতে থাকে নানা বয়সী মানুষ। তরুণ-তরুণীদের হাতে মোবাইল ফোন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ ছবি তুলছেন। প্রতিযোগী নৌকাগুলো যখন বৈঠা চালিয়ে নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন নদীর দুই তীর থেকে দর্শকরা উল্লাসধ্বনি, করতালি আর উৎসাহের স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন বৈঠিয়ালদের। এই উচ্ছ্বাসে গ্রামীণ সমাজজীবনের সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ঐতিহ্যের রঙ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শুক্রবার ছিল প্রতিযোগিতার সমাপনী দিন। এই দিনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম। তিনি শুধু প্রধান অতিথি হিসেবেই নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতি সমর্থন জানাতেও আসেন। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “আজকের এই নৌকাবাইচ আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে এনেছে। গ্রামের মানুষকে একত্রিত করে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি সবসময় এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগের পাশে থাকবে।” তার এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যের গুরুত্বকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক মো. সালাহ উদ্দিন রাজ্জাক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মোল্লা, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম পাবেল, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আমিরুল ইসলাম সোহেল এবং বাসসের জেলা প্রতিনিধি লিয়াকত হোসেন লিংকনসহ স্থানীয় বিশিষ্টজন। তাদের উপস্থিতি প্রতিযোগিতাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

আয়োজক কমিটির প্রধান গিয়াস উদ্দিন বলেন, “আমাদের এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখা, নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে বিনোদন দেওয়া। সফলভাবে এই আয়োজন শেষ হওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ সবাইকে, যারা অংশগ্রহণ করেছেন বা সমর্থন দিয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে এবং সুসংগঠিতভাবে এমন আয়োজন করার স্বপ্ন আমাদের রয়েছে।” তার এই বক্তব্য ভবিষ্যতের গ্রামীণ সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি উৎসব। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীতে পানির ঢল নামলে গ্রামবাংলার বিভিন্ন এলাকায় নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষ একত্রিত হয়, বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনও মজবুত হয়। হোগলাকান্দির কুমার নদে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

বর্তমান সময়ে আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু নৌকাবাইচের মতো আয়োজনগুলো প্রমাণ করে, মানুষ এখনো তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি আবেগ হারায়নি। বরং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য আরও শক্তভাবে টিকে থাকতে পারে। মোবাইল ফোনে মুহূর্তগুলো ধারণ করা তরুণ-তরুণীরা এই ঐতিহ্যকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করানোর নতুন পথ তৈরি করছে।

এ ধরনের আয়োজনে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। কারণ তারা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন না, বরং ঐতিহ্য রক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরছেন। গ্রামীণ সংস্কৃতি যদি এভাবেই টিকে থাকে এবং আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়, তবে তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

সবশেষে বলা যায়, হোগলাকান্দির কুমার নদে আয়োজিত নৌকাবাইচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে আনন্দ, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। হাজারো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, ঐতিহ্য যখন মানুষের প্রাণে মিশে থাকে, তখন সেটি কখনো হারিয়ে যায় না। বরং নতুন উদ্যমে আবার ফিরে আসে, ঠিক যেমন কুমার নদ আবারও সাক্ষী হলো এক অবিস্মরণীয় নৌকাবাইচ উৎসবের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com