লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী শহর বিনতে জবেইল রোববার আবারও ইসরায়েলি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ভয়াবহ এ হামলায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন, যাদের মধ্যে চারজন মার্কিন নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি। নিহতদের মধ্যে তিনজনই শিশু—সেলিন, হাদি ও আসিল। তাদের মা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। হামলায় আরও অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, স্থানীয় সময় রোববার দুপুরে ইসরায়েলি ড্রোন দক্ষিণ লেবাননের বিনতে জবেইলের একটি মোটরসাইকেল ও একটি প্রাইভেটকারকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরে যায় যানবাহনগুলোতে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিন শিশু ও তাদের পরিবারের আরেক সদস্য। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরেকজন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকা শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার শব্দে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানুষজন দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে থাকে।

লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি এক আবেগঘন ভাষণে প্রশ্ন তুলেছেন, “লেবাননের শিশুরা কি ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বের কোনো হুমকি সৃষ্টি করছে? তারা কেবল খেলছিল, বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাদেরও হত্যা করা হলো।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, ইসরায়েলের এ ধরনের হামলা বন্ধে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এ ঘটনাকে “নতুন হত্যাযজ্ঞ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, “এ হামলা নিছক সামরিক অভিযান নয়, এটি বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে একটি ভয়াবহ অপরাধ। শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখার জন্য যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চলছে, ইসরায়েলের এ ধরনের পদক্ষেপ সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।” প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, লেবানন সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করার পরিকল্পনা করছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ওই হামলায় হিজবুল্লাহর একজন সক্রিয় সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, হামলার শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষও। ইসরায়েল প্রায়শই দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় এবং যুক্তি হিসেবে বলে থাকে, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ সংগঠনটি যাতে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে না পারে, সে কারণেই এ ধরনের হামলা পরিচালিত হয়। তবে বাস্তবে এসব হামলার মূল শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

গত বছরের নভেম্বর মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের সীমান্তে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে একাধিকবার উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও এত বড় আকারের বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ হামলার পর পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের হামলা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে পুরোপুরি ভঙ্গ করে দেবে।

বিনতে জবেইল শহরটি লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে এটি বহু সংঘাতের সাক্ষী। হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত এ অঞ্চল অতীতে ইসরায়েলের একাধিক বিমান ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তে গুলিবিনিময় বা গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা যায়, কিন্তু তিন শিশু ও এক পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, “শিশুদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা অবিলম্বে এ ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।” ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক শাখাও এক বিবৃতিতে ইসরায়েলকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিহতদের মধ্যে চারজন মার্কিন নাগরিক হওয়ায় ওয়াশিংটন নীরব থাকতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তারা ঘটনাটি “গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন” এবং লেবানন ও ইসরায়েলের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য চাইছেন। তবে সমালোচকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে, ফলে তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এরপর একাধিকবার দক্ষিণ লেবাননে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মাঝেমধ্যে এ ধরনের হামলা লেবাননের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কে রাখে।

এই সাম্প্রতিক হামলা প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধবিরতির পরও শান্তির পথে অগ্রযাত্রা অত্যন্ত অনিশ্চিত। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও নারী যদি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করে, তাহলে কোনো শান্তিচুক্তিই টেকসই হতে পারে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলেছে, লেবাননের নিরীহ নাগরিকদের ওপর আঘাত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল।

বর্তমানে আহতদের চিকিৎসা চলছে স্থানীয় একটি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত একজনের অবস্থা গুরুতর। নিহত শিশুদের মরদেহ তাদের নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা শোক মিছিল করেছেন। এলাকাবাসী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন এবং বলছেন, “আমরা আর শিশুদের কবর দিতে চাই না, আমরা শান্তি চাই।”

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা কেবল একটি পরিবারকেই শোকাহত করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ভূমিকা নেবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে লেবাননের মানুষের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট—তাদের জীবন এখনো নিরাপদ নয়, এবং যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের হামলার ভয়াবহতা তাদের ছায়ার মতো তাড়া করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত