“মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার নতুন অধ্যায়”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা ঘটনাপ্রবাহকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কাতারে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে ইসরাইল এমন একটি সীমালঙ্ঘনের নজির তৈরি করেছে, যা শুধু একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করাই নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের সম্ভাবনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

কাতার দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল। দোহায় অবস্থিত হামাসের একটি প্রতিনিধি দল এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ে চলমান আলোচনার মাঝেই ইসরাইল এই হামলা চালায়। আক্রমণের মুহূর্তে সেখানে আমেরিকার প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বলে জানা গেছে। এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, এই হামলা আসলে একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করার জন্যই পরিচালিত হয়েছে।

ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি আঘাত। কূটনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা আলোচনার পরিবেশকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কেবল গাজা নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রচেষ্টা গভীর সংকটে পড়েছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৪৮ সালের নাকবা-পরবর্তী সময়ে যেমন অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও সেই সময়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিমতীর, ইয়েমেন এমনকি তিউনিসিয়াতেও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ভেঙে দিচ্ছে। এখন কাতারে আক্রমণ দেখিয়ে দিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশই আর ইসরাইলের নাগালের বাইরে নেই। পাকিস্তান থেকে মরক্কো, তুরস্ক থেকে সুদান—সব দেশই একই ধরনের হুমকির মুখে।

এ আক্রমণ আসলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ধারণার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ। ইসরাইল কৌশলগতভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আঞ্চলিক মানচিত্র নতুনভাবে সাজাতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সহযোগিতা বা প্রত্যক্ষ সমর্থন এ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করছে। ফলে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ছে।

যদি এ ধরনের আক্রমণের কোনো জবাব না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এরকম সীমালঙ্ঘন আরও বাড়বে। আঞ্চলিক সংঘাত সীমিত রাখার জন্য কয়েক দশক ধরে যে আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থা কার্যকর ছিল, সেটিও অকার্যকর হয়ে পড়বে। এতে অন্য রাষ্ট্রগুলোও একই ধরনের হামলায় উৎসাহিত হতে পারে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইল যে এত বড় একটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তা ওয়াশিংটনের অজ্ঞাতসারে হয়েছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন না। যদিও সরাসরি অনুমোদন দেওয়া না হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ইসরাইলকে অব্যাহত অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে এই আক্রমণের সহযোগী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো প্রদান, আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলকে রক্ষার চেষ্টা এবং তদন্তে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এর ফলেই ইসরাইল নিজেকে জবাবদিহির বাইরে মনে করছে এবং সীমাহীন আগ্রাসন চালাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থায় ওয়াশিংটনকে আর শান্তি রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু কাতারের মতো একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের ওপর ইসরাইলের সরাসরি হামলার পরও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারায় এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একইভাবে, আরব লীগও বছরের পর বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের কারণে কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারা ইসরাইলকে আরও উৎসাহিত করছে। ফলে আরব বিশ্বের সার্বভৌমত্ব ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জাতিসংঘ বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর প্রস্তাব ও ম্যান্ডেট অমান্য করেও ইসরাইল বারবার আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সংঘাত প্রতিরোধ বা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ অসহায় হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ যদি কেবল প্রতীকী বিবৃতির বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, আইনি জবাবদিহি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কাতার বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল দোহা। কিন্তু ইসরাইলের এই হামলা কার্যত সেই প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিয়েছে। এতে শুধু গাজা নয়, সমগ্র অঞ্চলে শান্তি প্রচেষ্টাই ব্যাহত হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। যদি এ ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া না আসে, তবে আগামী কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আরও অনিশ্চিত ও সহিংসতার দিকে ধাবিত হবে।

কাতারে ইসরাইলের হামলা একটি গভীর বার্তা দিয়েছে: মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই নিরাপদ নয়। সার্বভৌমত্ব, শান্তি আলোচনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়েছে। এ ঘটনার ফলে উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, জাতিসংঘের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সামনে কঠিন সময়। তারা হয় বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে জনগণকে সুরক্ষা দেবেন, নয়তো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন কিভাবে পুরো কূটনৈতিক ব্যবস্থা ধসে পড়ছে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত