চীনের জলবায়ু উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
চীনের জলবায়ু উদ্যোগ: ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭–১০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক যুগান্তকারী ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চীন ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে কিছু দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাকে ‘প্রতারণামূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্যারিস চুক্তির প্রেক্ষাপটে এবং এটি চীনের সর্বোত্তম প্রচেষ্টার প্রতিফলন। তিনি আরও জানান, চীনের মূল কার্বন নির্গমনের উৎসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে বেইজিং শহর। পাশাপাশি, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের হার আগামী কয়েক বছরে ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাবে এবং বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বৃদ্ধি করা হবে।

শি জিনপিং বলেন, “আমরা নতুন জ্বালানির যানবাহনকে বিক্রির মূলধারায় পরিণত করতে চাই। এটি আমাদের পরিবেশ বান্ধব নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, চীনের এই পদক্ষেপগুলো শুধু দেশের জলবায়ু নীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চীনের এই অঙ্গীকারকে জলবায়ু কর্মসূচিতে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হিসেবে চীনের প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাচ্ছে। এটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের উদ্ভাবনী পদক্ষেপ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎসাহ যোগাতে পারে।

তবে সমালোচকরা এই উদ্যোগের যথার্থতা নিয়ে সন্দিহান। বার্লিন ভিত্তিক পলিসি ইনস্টিটিউট ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্সের সিইও বিল হেয়ার আল জাজিরাকে বলেন, “চীনের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলেও, বাস্তবায়ন এখনও সঠিক মানদণ্ড পূরণে যথেষ্ট নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় চীনের প্রভাব এখনও সীমিত। চীনের কার্বন নির্গমন কমানোর প্রচেষ্টা যতটা সম্ভব কার্যকর হতে হলে আরও কড়া নীতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।”

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন, চীনের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিল্পায়িত অর্থনীতির কার্বন নির্গমন হ্রাস। চীনের এই পরিকল্পনা বিশেষত শক্তি, পরিবহন এবং শিল্প খাতগুলোকে প্রভাবিত করবে।

চীনের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে সৌর ও বায়ু শক্তির অবদান বৃদ্ধি এবং নতুন যানবাহনে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রচার। বিশেষ করে নতুন জ্বালানির যানবাহন চীনের পরিবহন খাতে দ্রুত প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং শহরাঞ্চলের বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালীন অন্যান্য বিশ্বনেতারা চীনের এই অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করছেন, চীনের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র দেশীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি ও সমঝোতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনের এই উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি শুধুমাত্র কার্বন নির্গমন হ্রাসের জন্য নয়, দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে উৎসাহিত করা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা স্থাপন করবে। এছাড়া, এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু নীতি বাস্তবায়নে চীনের প্রভাব বাড়াবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই পদক্ষেপ সমগ্র এশিয়া অঞ্চলের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উৎসাহিত করবে, যাতে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করছেন, চীনের অঙ্গীকার সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। শিল্পায়িত অর্থনীতিতে প্রচলিত কয়েকটি কার্বন নির্গমন উৎস এখনও পর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এছাড়া, দেশের দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে কার্বন নির্গমনের হার কমানো কঠিন হতে পারে। এই দিকগুলোতে নজর দিয়ে চীনকে আরও কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।

চীনের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এই অঙ্গীকারের প্রভাব, সম্ভাব্য বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য দেশের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই পদক্ষেপ সম্মেলনে আলোচনা হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু নীতি ও উদ্যোগকে নতুন মাত্রা দেবে।

সংক্ষেপে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং নতুন জ্বালানির যানবাহনকে জনপ্রিয় করা এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। যদিও কিছু সমালোচক কার্যকারিতার বিষয়ে সন্দিহান, তবুও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশকে উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রভাবিত করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত