ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পাকিস্তান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
সিলেটের ভূমিকম্প ও করণীয়: প্রশাসন কতটা প্রস্তুত?

প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

পাকিস্তান আবারও ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠেছে। শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল নাগাদ ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে। পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তরের (পিএমডি) সিসমিক নেটওয়ার্ক এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা। প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার গভীরে এর উৎপত্তি ঘটে এবং তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে। রাজধানী ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ারসহ খাইবার পাখতুনখোয়ার অন্তত কয়েকটি জেলায় এর স্পষ্ট কম্পন অনুভূত হয়।

ভূমিকম্প আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির অফিসপাড়া, ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকা থেকে লোকজন দ্রুত বের হয়ে আসে। পেশোয়ার শহরের বিভিন্ন স্থানে মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় জড়ো হয়। অনুরূপ দৃশ্য দেখা যায় সোয়াত, চিত্রাল, লোয়ার দির, মারদান ও বুনের মতো পার্বত্য অঞ্চলগুলোতেও। স্থানীয় গণমাধ্যম সামা টিভির খবরে বলা হয়, ভূমিকম্পের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হলেও আতঙ্কিত মানুষ কোনো ঝুঁকি না নিয়ে খোলা স্থানে অবস্থান নেয়।

খাইবার জেলার ল্যান্ডিকোটাল অঞ্চলে মূল ভূমিকম্পের পর একাধিক আফটারশক অনুভূত হয়েছে। এতে মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, আতঙ্কে নারী-পুরুষ ও শিশুদের ভবন থেকে দৌড়ে বের হতে। অনেক এলাকায় স্কুল ও বাজারের কার্যক্রম সাময়িক সময়ের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে পাহাড়ি এলাকায় ক্ষুদ্র আকারে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের টেকটোনিক ফল্ট লাইনগুলোর কারণে প্রায়ই মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়ে থাকে। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও এর আশপাশের জেলা এসব ভূমিকম্পে সরাসরি প্রভাবিত হয়। এ কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পভীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. রহিমুল্লাহ জানান, হিন্দুকুশ অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য একটি সক্রিয় কেন্দ্র। গভীর ভূমিকম্প সাধারণত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না ঘটালেও ভয়াবহতা তৈরি করতে পারে, কারণ তা বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের ভূমিকম্প হওয়া অব্যাহত থাকতে পারে এবং সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলায় প্রশাসন জরুরি সাড়া প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। উদ্ধার ও স্বাস্থ্যসেবা দলগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়।

ইসলামাবাদের বাসিন্দা আমির খলিল গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি অফিসে বসে কাজ করছিলাম, হঠাৎ টেবিল ও চেয়ার দুলতে শুরু করে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে বাইরে ছুটে যাই। কয়েক মিনিট পরে বুঝতে পারি ভূমিকম্প হয়েছে। যদিও ক্ষতি হয়নি, তবে ভয়ের অনুভূতি এখনো কাটেনি।”

পাকিস্তানের ইতিহাসে ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০৫ সালে কাশ্মীরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। এর পরেও দেশটিতে মাঝেমধ্যেই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে থাকে, যা মানুষকে সেই ভয়াবহ স্মৃতির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সাম্প্রতিক এই ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পও জনগণের মনে সেই পুরনো শঙ্কাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমানা অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এখানে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষে ভূমিকম্প ঘন ঘন হয়। টেকসই অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণ নীতিমালা না থাকায় পাকিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় এমন ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে জরুরি পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি অপরিহার্য।

এদিকে, ভূমিকম্পের ঘটনার পর পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য পোস্ট ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা। কেউ কেউ বলেন, বাড়ির দেয়াল কেঁপে ওঠায় তারা মনে করেছিলেন হয়তো কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছে। আবার কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে যেন ভবন ধসে পড়বে ভেবে তারা ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় খবর পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। তবে প্রাথমিক তথ্য বলছে, প্রাণহানি ঘটেনি।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী হিন্দুকুশে ভূমিকম্প কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু মানুষের জীবন ও অবকাঠামো রক্ষায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও মারাত্মক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পাকিস্তান সরকারও সচেতনতার পাশাপাশি ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

সর্বশেষ এই ভূমিকম্প দেশটির নাগরিকদের মনে আবারও প্রমাণ করল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে মানুষ কতটা অসহায়। আতঙ্কের সেই মুহূর্ত কাটলেও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি আর ঝুঁকির আশঙ্কা তাদের ভেতর রয়ে গেছে। পাকিস্তানের জনগণ মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত