অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিপদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৯৩ বার
শর্ট টাইটেল: অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিপদ

প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মানুষ ও প্রাণীর শরীরে নানা ধরনের জীবাণু প্রবেশের ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেয়। এই রোগগুলো প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হয় অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক প্রয়োগ রোগের ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে এবং তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করে। চিকিৎসকরা রোগভেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোর্সের পরামর্শ দেন, যাতে আক্রান্ত ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি নিধন হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক রোগী অল্প কয়েক দিনের ব্যবহারেই ওষুধ বন্ধ করে দেন, যদিও কোর্স সম্পূর্ণ করা হয়নি। এতে ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থেকে ভবিষ্যতে ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মূল কারণ।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য নয়; এটি সংক্রমণের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বাজারে থাকা অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ইতিমধ্যেই মানুষের এবং পশুর শরীরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেছে। এটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারবার সতর্ক করেছে যে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এখন স্থানীয় সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সঙ্কট। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ সংক্রমণের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন, এবং গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আজকের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রায় ১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মৃত্যুর সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। গভীর বৈশ্বিক বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এটি প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার, রোগী নিজের ইচ্ছামতো কোর্স শেষ না করা, ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং খাদ্য বা পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ ব্যবহার এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, জ্বর বা সর্দি-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত আরাম দেয়, অথচ এই ধরনের ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই।

চিকিৎসকরা বারবার বলেন, সব রোগের জন্য একই অ্যান্টিবায়োটিক প্রযোজ্য নয়। রোগভেদ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা এবং নির্ধারিত কোর্স শেষ করা আবশ্যক। কোর্স অসম্পূর্ণ রাখলে বা অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহার করলে শারীরিক ঝুঁকি বেড়ে যায়। এতে অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও পেশির খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব হলো ভবিষ্যতে প্রাণরক্ষাকারী ওষুধও কার্যকর না হওয়া। যদি আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন না হই, তাহলে এমন এক সময় আসবে, যখন সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণও জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবে। এটি এক ধরনের “পুনঃপ্রাকৃতিক যুগের সংকট”, যেখানে অল্প জীবাণুর কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সমস্যায় ঘেঁষছে। ফার্মাসিউটিক্যাল নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা, জনগণের অপ্রতিষ্ঠিত ব্যবহার এবং পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ ব্যবহার এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নীতি প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে এই সংকটের প্রভাবও লক্ষণীয়। ফার্মেসি থেকে ইচ্ছেমতো ওষুধ কেনা, চিকিৎসকের নির্দেশনা না মানা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং রোগপ্রবণ ব্যক্তিরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রোগী এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ ব্যবহার, কোর্স সম্পূর্ণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে বিরত থাকা আবশ্যক। শুধু চিকিৎসক নির্দেশিত কোর্স অনুসরণ করলে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা বজায় থাকবে এবং প্রতিরোধ কমবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্য হুমকি। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যকেই প্রভাবিত করে না, বরং সংক্রমণের মাধ্যমে সমাজের প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং কঠোর নীতি প্রণয়ন ছাড়া এই সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চিকিৎসক পরামর্শ অনুসরণ, কোর্স সম্পূর্ণ করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার এড়িয়ে চলাই এই বিপদ থেকে নিজেকে এবং সমাজকে রক্ষা করার মূল পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত