দিল্লি সহ ভারতের শত শত স্কুল ও বিমানবন্দরে বোমা হামলার হুমকি
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আপডেট টাইম :
সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৭৫
বার
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এবং আশপাশের অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র নিরাপত্তা সংকট। রবিবার সকালেই দিল্লির প্রায় ৩০০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেশ কয়েকটি বিমানবন্দরে একযোগে বোমা হামলার হুমকি পাঠানো হয় ইমেইলের মাধ্যমে। ইমেইলে লেখা ছিল, “ভবনের চারপাশে বোমা রাখা হয়েছে, প্রতিক্রিয়া দেখাও অথবা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হও।” বার্তায় আরও জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় না করতে পারলে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এই হুমকি পাওয়ার পর থেকেই প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষক-অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রবিবার ভোর ৬টা ৮ মিনিটে একযোগে শত শত ইমেইল আসে। এর মধ্যে রাজধানীর দ্বারকা সিআরপিএফ পাবলিক স্কুল এবং কুতুব মিনারের কাছের সর্বোদয় বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি স্কুলের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। আতঙ্কে দ্রুত ওই সব স্থাপনায় পুলিশ, দমকল ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল পাঠানো হয়। পুরো এলাকা ঘিরে চলে টানা তল্লাশি অভিযান। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভিযান চালিয়েও কোথাও কোনো বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি।
শুধু এদিনই নয়, গত কয়েক মাস ধরেই দিল্লি ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বারবার একই ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে। এক সপ্তাহ আগে ডিপিএস দ্বারকা, কৃষ্ণ মডেল পাবলিক স্কুল ও আরেকটি সর্বোদয় বিদ্যালয়ে একযোগে বোমা হামলার হুমকি পাঠানো হয়েছিল। প্রতিবারই আতঙ্ক ছড়ালেও তল্লাশিতে বিস্ফোরক মেলেনি। বারবার এ ধরনের ভুয়া হুমকিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়ছে, তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিক চাপে ফেলে দিচ্ছে এই ভুয়া হুমকি। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও একাধিকবার স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো হলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটছে না।
এই ইমেইল শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আরও কয়েকটি বড় বিমানবন্দরও একই বার্তা পেয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সতর্কতা জারি করে এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তল্লাশি শুরু করে। যাত্রীদের নিরাপত্তা প্রটোকল আরও জোরদার করা হয়, ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রমে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। তবে শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো বোমা বা বিস্ফোরক মেলেনি।
পুলিশ জানিয়েছে, এই হুমকি পাঠানোর পেছনে ‘টেরোরাইজার্স১১১’ নামে একটি অজ্ঞাত গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে। তবে এদের পরিচয়, উদ্দেশ্য বা অবস্থান সম্পর্কে এখনও কিছু নিশ্চিত করা যায়নি। ইমেইলগুলো কোন সার্ভার থেকে পাঠানো হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে সাইবার বিশেষজ্ঞরা তদন্ত শুরু করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, এটি সংগঠিত সাইবার অপরাধচক্রের কাজও হতে পারে, যারা জনমনে ভয় তৈরি করতে এবং প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। দিল্লি পুলিশকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তল্লাশির পাশাপাশি স্কুল প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিমানবন্দরগুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, প্রতিবারের মতো এবারও ভুয়া হুমকি হলেও কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের জীবনের প্রশ্নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্তে সাইবার টিম ও বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থা যুক্ত হয়েছে। এই হুমকি শুধু রাজধানীর নিরাপত্তাকেই নয়, গোটা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
অভিভাবকরা বলছেন, একের পর এক ভুয়া হুমকি তাদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে প্রতিদিন নতুন করে চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। “সকালবেলা যখন খবর আসে কোনো স্কুলে বোমা হুমকি এসেছে, তখন মনে হয় সন্তানের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে,” মন্তব্য করেন দ্বারকার এক অভিভাবক। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও ভয় ও অনিশ্চয়তায় পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনা ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বারবার ভুয়া হুমকি পাঠিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা আসলে এক ধরনের সন্ত্রাস কৌশল। এতে জনসাধারণের আস্থা দুর্বল হয় এবং প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা এ ধরনের হুমকি পাঠাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য কেবল ভয় দেখানো হলেও ভবিষ্যতে বাস্তব হামলার আড়াল তৈরির চেষ্টা থাকতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
ভারতের রাজধানী ও বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার বোমা হুমকি নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সাইবার অপরাধের ঝুঁকি সামনে এনে দিয়েছে। প্রশাসন এখন পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম, বিমান চলাচল এবং জনজীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুমকির মূল উৎস শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ভুয়া আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে।
শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। অন্যথায়, একের পর এক এই ধরনের হুমকি কেবল জনজীবনকে অচল করে তুলবে না, বরং দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।