গাজার যুদ্ধবিরতি, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
গাজার রক্তাক্ত ত্রাণযুদ্ধ: ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত ৭৪৩ ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং এমনকি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশ্বনেতাদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কেবল গাজার ভয়াবহ মানবিক সংকট লাঘবই হবে না, বরং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রশংসা করেছেন এবং এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হামাসের এখন এই পরিকল্পনায় সম্মত হওয়া উচিত। অস্ত্র সমর্পণ ও সব জিম্মির মুক্তি দিয়ে গাজার জনগণের দুর্ভোগের অবসান ঘটানোই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব। স্টারমারের এই বক্তব্য পশ্চিমা বিশ্বে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ব্রিটিশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা বলেছেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় তিনি উৎসাহিত হয়েছেন। তার মতে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। কস্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন শান্তি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক সহায়তা এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টও ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ অবসান ও জিম্মি মুক্তির প্রচেষ্টায় ফ্রান্স সরাসরি ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ফ্রান্স বরাবরই মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে, আর এবারও তাদের অবস্থান একই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই বিশ্লেষকদের মত। ফরাসি প্রেসিডেন্টের এ ধরনের প্রতিশ্রুতি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে একটি আন্তর্জাতিক সমন্বিত প্রচেষ্টার সম্ভাবনাকে জোরদার করেছে।

পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবকে আন্তরিক প্রচেষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা গাজা যুদ্ধের অবসান, সেখানে মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এটি উল্লেখযোগ্য কারণ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন খুঁজছে এবং এবার তাদের ইতিবাচক অবস্থান শান্তি আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নে প্রস্তুত এবং তারা মনে করেন, এটি একটি দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের দিকে পথ খুলে দিতে পারে। তাদের দৃষ্টিতে গাজা পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত হয়ে পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়াটাই হবে স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্বনেতাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে একটি বৈশ্বিক সমর্থন এনে দিয়েছে। যদিও সমালোচকরাও আছেন। তাদের মতে, পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে হামাসের বাস্তব পদক্ষেপ, ইসরাইলি সরকারের আন্তরিকতা এবং আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার ওপর। হামাস কি সত্যিই অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং সুরঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সম্মত হবে কিনা তা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এই পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্বনেতাদের একযোগে প্রতিক্রিয়া গাজার জনগণের কাছে আশার আলো জ্বালিয়েছে। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে যাওয়া গাজা দীর্ঘদিন ধরে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রবাহিত হলে এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে সেখানকার সাধারণ মানুষ নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে। বিশ্বনেতারা যে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, সেটিই এখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজা যুদ্ধ শেষ করতে এবং অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে ট্রাম্পের এই ২০ দফা পরিকল্পনা কার্যকর হবে কিনা—এটি সময়ই বলে দেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর একত্রিত অবস্থান প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সদিচ্ছা অন্ততপক্ষে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত