আফগানদের বিপক্ষে রোমাঞ্চ জয়ে বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮৭ বার
লিটন দাসের নেতৃত্বে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যাচ মানেই যেন নাটকীয়তা, রোমাঞ্চ আর অপ্রত্যাশিত মোড়। এমন এক দ্বন্দ্ব-সংশয়ের আবহেই আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে জয় পেল টাইগাররা। দেড়শ রানের লক্ষ্যকে সহজ করে শুরু করেও এক সময় হার নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নুরুল হাসান সোহান ও তরুণ রিশাদ হোসেনের ঠাণ্ডা মাথার ব্যাটিং বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে বড় ধাক্কা থেকে। চার উইকেট হাতে রেখে এই জয় শুধু সিরিজে ১–০ তে এগিয়ে যাওয়ারই গল্প নয়, বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরনো দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার এক প্রতীকী প্রমাণও হয়ে উঠেছে।

আফগানিস্তান টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামে। শারজাহর উইকেট সাধারণত ব্যাটসম্যানদের পক্ষে যায়, কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা শুরুতেই চাপে ফেলে দেয় প্রতিপক্ষকে। নাসুম আহমেদ ইনিংসের প্রথম দিকেই ওপেনারকে ফিরিয়ে দেন। এরপর তরুণ পেসার তানজিম হাসান সাকিবও শুরুর সাফল্য এনে দেন। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে আফগানরা। এক পর্যায়ে তাদের সংগ্রহ খুব একটা বড় হবে না বলেই মনে হচ্ছিল। তবে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবীর ব্যাটে পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি ২৫ বলে ৩৮ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তাঁর সঙ্গে শরফউদ্দীন খান ২৫ বলে ১৭ রান যোগ করেন। শেষ ওভারে ১৩ রান তুলে আফগানিস্তান নির্ধারিত ২০ ওভারে থামে ১৫১ রানে।

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন তানজিম ও রিশাদ। দুজনেই দুটি করে উইকেট নেন। নাসুম ও অভিজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান নেন একটি করে উইকেট। তুলনামূলক কম রান তাড়া করতে নামলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ শুরুতে যে দাপট দেখায়, তাতে ম্যাচটি একপেশে হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছিল।

ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমন গড়ে তোলেন শতরানের জুটি। তাদের ব্যাট থেকে আসে আত্মবিশ্বাসী শট। ৩৭ বলে ৫৪ রান করেন পারভেজ, আর সমান বল খেলে ৫১ রান করেন তানজিদ। প্রথম উইকেট পতন হয় ১০৯ রানে। এতক্ষণে বাংলাদেশ অনেকটাই নিশ্চিত জয়ের পথে ছিল। দর্শক, সমর্থক থেকে শুরু করে ড্রেসিংরুম—সবাই ভেবেছিল সহজ জয় আসবে এবার।

কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসী দৃশ্যপট হঠাৎই ধসে যায় রশিদ খানের এক ওভারের ঘূর্ণিজাদুতে। তিনি এক ওভারেই ফেরান সাইফ হাসান ও সেট ব্যাটসম্যান তানজিদকে। এরপর পরের ওভারে তিনি আঘাত হানেন আরও গভীরে, আউট করেন অধিনায়ক জাকের আলী অনিককে। একইসঙ্গে ফেরান তরুণ শামীম পাটোয়ারীকেও। চোখের পলকে ১০৯/০ থেকে ১১৮/৬ হয়ে যায় বাংলাদেশের স্কোরবোর্ড।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ ক্রিকেট সমর্থকদের মনে করিয়ে দেয় গত বছরের আফগানিস্তানের বিপক্ষে শারজাহরই আরেক ম্যাচের দুঃসহ স্মৃতি। ২৩৫ রান তাড়া করতে নেমে ২৩ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৪৩ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই হতাশাজনক হারের ছায়া যেন আবারও ভর করেছিল দলের ওপর। সামাজিক মাধ্যমে সমর্থকরা তখনই ভয়ে বলছিলেন—“আবারও কি ভাঙা স্বপ্ন দেখতে হবে?”

তবে এবার বাংলাদেশ দল হার মানতে রাজি হয়নি। সপ্তম উইকেটে নেমে আসেন নুরুল হাসান সোহান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রিশাদ হোসেন। এই দুজনের ব্যাটে শুরু হয় ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার গল্প। সোহান ও রিশাদ মাত্র ১৮ বলে গড়ে তোলেন ৩৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। নুরুল শেষ দিকে আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের ওভারে টানা দুটি ছক্কা হাঁকান। রিশাদ মারেন একটি চমৎকার বাউন্ডারি। এভাবেই ১৯তম ওভারেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের। শেষ পর্যন্ত সোহান ২০ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন, রিশাদ থাকেন অপরাজিত ১২ রানে।

ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে ছিল স্বস্তির নিশ্বাস। সহজ জয় প্রায় হাতছাড়া হলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য সোহান ও রিশাদকে বিশেষ কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের ভেতরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এই দুই ক্রিকেটার। কোচ ও অধিনায়ক উভয়েই তাদের ঠাণ্ডা মাথার ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করেছেন।

বাংলাদেশের জয়ের পেছনে বড় অবদান রাখলেও এবার আবারও সামনে এসেছে দলের ‘মিডল অর্ডার সংকট’। ওপেনাররা দারুণ শুরু দিলেও মাঝের দিকে রশিদ খানের ঘূর্ণি আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ব্যাটসম্যানরা। বিশেষ করে অভিজ্ঞতার অভাব ও চাপ সামলানোর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমস্যা সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বড় ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশকে আবারও হারের মুখে পড়তে হবে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণের প্রশংসা করতে হয়। বিশেষ করে রশিদ খান দেখিয়েছেন কেন তিনি বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি বোলারদের একজন। একাই ৪ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচকে উল্টে দেওয়ার অবস্থায় নিয়ে যান তিনি। তবে দলের ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশিত রান তুলতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তা জয় এনে দিতে পারেনি আফগানদের।

এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সিরিজের বাকি দুটি ম্যাচ এখন অনেক বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তান প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া থাকবে, আর বাংলাদেশ চাইবে সিরিজ নিজেদের করে নিতে।

বাংলাদেশ দলের সমর্থকদের জন্য এই জয় যেমন স্বস্তির, তেমনি সতর্কবার্তাও বটে। কারণ ম্যাচের সহজ সমীকরণ একসময় কতটা জটিল হয়ে উঠতে পারে, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এই ম্যাচ। ক্রিকেটে জয়-পরাজয় থাকবেই, তবে বারবার একই ভুল করলে তা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। তাই কোচিং স্টাফ ও ম্যানেজমেন্টকে এখন থেকেই মিডল অর্ডার শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিতে হবে।

শারজাহর রাতের ম্যাচটি তাই এক কথায় নাটকীয়তার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সহজ ম্যাচ কঠিন করে জেতার অভ্যাস যেন এখন বাংলাদেশের রক্তে মিশে গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত জয়ই মুখ্য, আর সেই জয়টাই এনে দিয়েছে সিরিজে এগিয়ে যাওয়ার স্বস্তি। দর্শকদের কাছে ম্যাচটি রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা, আর ক্রিকেটারদের কাছে এটি শিক্ষা—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছেড়ে লড়াই করলে জয় আসবেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত