মায়ের মৃত্যুর ৩৬ বছর পর বাবার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫১ বার

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

খুলনায় মায়ের মৃত্যুর ৩৬ বছর পর তার কন্যা বাবার বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা করেছেন। অভিযোগকারি শেখ তামান্না আলম, খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার কেডিএ এপ্রোচ রোডের বাসিন্দা। মামলার আসামি ডা. শেখ বাহারুল আলম বাহার, এপিসি ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান। তিনি খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনার সভাপতি। মামলাটি খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সোনাডাঙ্গা আমলি আদালতে দায়ের করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালের ১৩ নভেম্বর রাত ৪টার দিকে তৎকালীন খ্যাতনামা গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সামসুন্নাহার মিলনের গলায় রশি বাঁধা অবস্থায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। অভিযোগে তামান্না আলম উল্লেখ করেছেন, তার বাবা ডা. বাহারুল আলম তার মাকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক এবং পেশাগত প্রভাবশালী বাবার পরকীয়া সম্পর্ক ও নির্মম শারীরিক নির্যাতনের কারণে তার মা মৃত্যুর মুখে পতিত হন।

এজাহারে তামান্না আলম বলেন, তার বাবা-মায়ের বিয়ে প্রেমের সম্পর্কের ভিত্তিতে হলেও, বিবাহের পর ডা. বাহারুল আলমের পরকীয়া সম্পর্কের বিরোধিতা করতেন তার মা। এতে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন। দুই কন্যাকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পাঠানোর পরিকল্পনা শুরু করলে, সম্পদের লোভে ডা. বাহার তার স্ত্রীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন।

১৯৮৯ সালের ১৩ নভেম্বর রাত ১২টার পর বাবার সঙ্গে তার মায়ের তুমুল ঝগড়া হয়। ওই রাতে তামান্না আলাদা রুমে ছিলেন, আর ছোট বোন মা-বাবার সঙ্গে ঘুমাত। পরদিন ভোর ৪টার দিকে বাবা তাকে ঘুম থেকে ডেকে ড্রইং রুমে নিয়ে যান। সেখানে তার মায়ের ঝুলন্ত দেহ দেখে তামান্না চিৎকার করেন। বাবার নির্দেশমতো তিনি মায়ের গলার রশি খুলে নিচে নামান। ডা. বাহার নিজেই মৃত ঘোষণা করেন। এরপর লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়। তবে তৎকালীন সময়ের প্রমাণ অনুযায়ী এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বা আত্মহত্যা হিসেবে ধরা হয়।

তামান্না আলম জানান, লেখাপড়া শেষে তিনি কানাডায় বসবাস করতে শুরু করেন। এ সময় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন নারীর অবৈধ সম্পর্ক দেখা যায়। দেশে অবস্থানরত তার ছোট বোন ডা. শেখ তাসনুভা আলমের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। পারিবারিক বিষয় মীমাংসার জন্য দেশে ফিরে তামান্না আলম বাবার নানা অপকর্মের প্রমাণ পান। এরপর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সকালে বাবা তুমুল বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হুমকি দেন, যা তামান্না বুঝতে পারেন তার মায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, বরং খুন করা হয়েছে। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং পরিবারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিশ্চিত হন, তার মা ডা. সামসুন্নাহারকে হত্যা করা হয়েছে।

ডা. শেখ বাহারুল আলম এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তার স্ত্রী স্বইচ্ছায় আত্মহত্যা করেছিলেন। সোনাডাঙ্গা থানার পুলিশ তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার স্ত্রীর দেহ থেকে নামিয়েছিল। সেই সময়ে পোস্টমর্টেমের জন্য সিভিল সার্জন উপস্থিত ছিলেন। স্বইচ্ছায় আত্মহত্যার কারণে তখন কোনো মামলা হয়নি। তিনি মনে করেন, এত বছর পর তামান্না আলম কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে মামলা করেছেন। তিনি বলেন, “মামলার ধার্য দিনে আদালত আমাকে সমন জারি করলে সেখানে আমার বক্তব্য রাখব। আমি এই মামলায় বিচলিত নই। আমার স্ত্রীর একটি সুইসাইডাল নোট ছিল, যা আমি আদালতে প্রদর্শন করব।

এই মামলার মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের পুরনো ঘটনা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। পারিবারিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, এবং পেশাগত ক্ষমতা—সবই এই মামলার পটভূমিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মামলাটি শুধু পারিবারিক বিরোধের প্রশ্ন উত্থাপন করে না, বরং সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন কিনা তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

মামলাটি আদালতে চলার সঙ্গে সঙ্গে তামান্না আলম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা, এবং মামলার যথাযথ তদন্তের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পুনঃবিচার এবং ন্যায়িক প্রক্রিয়া সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত