প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানী ঢাকার জনবহুল এলাকা মিরপুরে মালিকানা দ্বন্দ্বের জেরে যাত্রীবাহী একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে শেওড়াপাড়ার ২৬৬ নম্বর মেট্রোরেল পিলারের কাছে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। আলিফ পরিবহনের একটি বাসে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বাসযাত্রীরা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি পরিবহন মালিকানা ও চেকার নিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধের ফলাফল। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে জানান, হঠাৎ দুই থেকে তিনজন ব্যক্তি বাসে ওঠে এবং যাত্রীদের নেমে যেতে বলে। যাত্রীরা নামার পরপরই তারা বাসে আগুন ধরিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার সময় বাসটি মিরপুর থেকে আগারগাঁওয়ের দিকে যাচ্ছিল এবং এতে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া প্রায় অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ বলেন, খবর পাওয়ার সাথে সাথে দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে আগুন লাগানোর সময়কার বর্ণনা দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কয়েকজন যুবক পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালায়। তারা এসে যাত্রীদের বের করে দিয়ে বাসে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় বাসটির ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, ইঞ্জিনের কিছু অংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু যাত্রীদের মধ্যে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় তা পুরো ঘটনাটিকে ভয়াবহ করে তোলে। অনেক যাত্রী জানান, প্রথমে তারা ভেবেছিলেন এটি ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের চেষ্টা। তবে যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে দেওয়ার পরপরই আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় তারা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। বাসচালক ও সহকারীও এ ঘটনায় অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এ ঘটনার পর আশপাশের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিডিও বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নিয়ে অগ্নিসংযোগকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করেছে এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
মিরপুরসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় পরিবহন মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। পরিবহন মালিকানা ও পরিচালনায় থাকা দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। একাধিক মালিকানা গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেখা যায় এবং এর জের ধরেই সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন সেক্টরের একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন, চেকার নিয়োগ, টার্মিনালে প্রভাব বিস্তার ও দৈনিক আয় ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায়ই সংঘাত বাঁধে। শুক্রবার সকালের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার ফলে যাত্রীরা শুধু নিরাপত্তাহীনতাই বোধ করছেন না, বরং রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে পরিবহনের উপর নির্ভর করতে হয়। তারা বলছেন, যাত্রীবাহী বাসে এ ধরনের পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ কেবল সম্পদের ক্ষতিই করে না, এটি যাত্রীদের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, পরিবহন সেক্টরের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও মালিকানা দ্বন্দ্বের ফলেই এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। জনগণের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে মালিকানা নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় গোষ্ঠীগুলোর এ ধরনের পন্থা গ্রহণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পরিবহন খাতে অনিয়ম ও দৌরাত্ম্য বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সন্দেহভাজনদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে। ঘটনাস্থলে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
অগ্নিসংযোগের কারণে সড়কের যানচলাচলও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। সকালে ব্যস্ততম সময়ে ঘটনার কারণে শেওড়াপাড়া থেকে আগারগাঁও এবং মিরপুরমুখী সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সচেষ্ট থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।
ঘটনাটি নতুন করে পরিবহন খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মালিকানা দ্বন্দ্বের নামে যে ধরণের সহিংসতা বেড়ে চলেছে তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যাত্রীবাহী পরিবহন ব্যবস্থা দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই এ খাতে সহিংসতা রোধে প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং এ ধরণের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না।
উপসংহারে বলা যায়, রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুধু একটি বাস পুড়ে যাওয়া নয়, বরং এটি পরিবহন খাতের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। মালিকানা দ্বন্দ্বের নামে সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই সহনীয় নয়। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়।