ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে উয়েফার কোর্টে বল ঠেলে দিলো ফিফা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে উয়েফার কোর্টে বল ঠেলে দিলো ফিফা

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ব ফুটবলে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ও সহিংসতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা, ফুটবলপ্রেমী ও রাজনৈতিক নেতারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলছেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবল থেকে দেশটিকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গটি এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে ফিফার অবস্থান ও উয়েফার সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক আক্রমণ চালায়। তার মাত্র এক সপ্তাহ পর ১ মার্চ ফিফা ও উয়েফা যৌথভাবে রাশিয়াকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসে এত দ্রুত ও কড়া সিদ্ধান্ত আগে দেখা যায়নি। বিশ্বব্যাপী ফুটবল পরিবার তখন একমত হয়েছিল, যুদ্ধ চালানো কোনো রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় আগ্রাসন চালানো সত্ত্বেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হচ্ছে?

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার শামিল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন সোচ্চার হয়েছে। স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তি দেশগুলোও উয়েফার কাছে দাবি তুলেছে ইসরায়েলকে বহিষ্কারের। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশ কাতারও এ দাবিকে সমর্থন করছে। কারণ কাতার দীর্ঘদিন ধরেই উয়েফার সঙ্গে সম্প্রচারস্বত্ব ও স্পন্সরশিপ চুক্তির মাধ্যমে জোরালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কাতারের চাপই উয়েফাকে সাম্প্রতিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আনতে বাধ্য করেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে ফিফার ওপরও একই রকম চাপ আসছে। তবে সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একে সরাসরি রাজনৈতিক সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার প্রধান কার্যালয়ে এক কাউন্সিলর সভায় তিনি বলেন, “আজ বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান সংঘাতে যারা কষ্ট পাচ্ছেন তাদের প্রতি আমাদের সমবেদনা। ফুটবল যে বার্তাটি দিতে পারে তা হলো শান্তি ও ঐক্য। ফিফা ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারে না। তবে ফুটবলের ঐক্যবদ্ধ, শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে প্রচার করতে চাই।”

ফিফা প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য অনেককে হতাশ করেছে। সমালোচকরা বলছেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ফিফা যেন রাজনৈতিক চাপে নিরপেক্ষতার ভান করছে। তবে ইনফান্তিনো আরও জানিয়েছেন, তিনি ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) প্রেসিডেন্ট জিব্রিল রাজৌবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আমি রাষ্ট্রপতি রাজৌব এবং পিএফএ-এর স্থিতিস্থাপকতাকে শ্রদ্ধা জানাই। ফিফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—বিভক্ত বিশ্বে মানুষকে একত্রিত করতে ফুটবলের শক্তি ব্যবহার করবে।”

তবে বিতর্ক আরও বেড়েছে ফিফার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কনমেবলের সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানির বক্তব্যে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ইসরায়েল উয়েফার সদস্য। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেবল উয়েফার।” অর্থাৎ ফিফা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে বলটি উয়েফার কোর্টে ঠেলে দিয়েছে। ফলে এখন ইউরোপের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিই ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

এমন অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে দ্বিমত স্পষ্ট। একদিকে মানবাধিকার সংগঠন ও ফুটবলপ্রেমীরা দাবি তুলেছেন, রাশিয়ার মতো ইসরায়েলকেও অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা হোক। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ক্রীড়াঙ্গন থেকে দেশটিকে বহিষ্কারের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কঠোর অবস্থান নেবে। এই অবস্থান ফিফা ও উয়েফার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

এদিকে ইসরায়েলের সামনে এখনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে। আগামী ১১ অক্টোবর নরওয়ের বিপক্ষে অসলোয় এবং ১৪ অক্টোবর ইতালির বিপক্ষে উদিনেতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলবে তারা। প্রশ্ন উঠছে—এই ম্যাচগুলো আদৌ হবে কি না, নাকি শেষ মুহূর্তে কোনো নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে ইসরায়েল।

ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিফার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও উয়েফার ওপর চাপ আন্তর্জাতিক ফুটবলে অস্থিরতা তৈরি করছে। যদি ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও। আবার যদি নিষিদ্ধ না করা হয়, তবে প্রশ্ন উঠবে রাশিয়া ও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী আচরণের।

ফুটবল সবসময় শান্তি, বন্ধুত্ব ও মানবিকতার বার্তা বহন করে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা ও রাজনীতির প্রভাব এ খেলাতেও প্রবল। ফিফা হয়তো সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, কিন্তু উয়েফার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত উয়েফা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ফুটবলে টিকে থাকার ভবিষ্যৎ।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ফুটবল যদি সত্যিই ঐক্যের প্রতীক হতে চায়, তবে যেকোনো রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। নতুবা ফুটবলও বৈষম্য ও ভণ্ডামির অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।

সব মিলিয়ে এখন নজর থাকবে উয়েফার আসন্ন বৈঠকের দিকে। রাশিয়ার মতো ইসরায়েলকেও নিষিদ্ধ করা হবে কি না, নাকি ফিফা ও উয়েফা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করবে—সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত