হবিগঞ্জের মাধবপুরে এলজিইডির রাস্তার অর্ধশতাধিক আকাশমনি গাছ চুরি, নীরব প্রশাসন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৬ বার

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বহরা ইউনিয়নে রাস্তার দুই পাশের অর্ধশতাধিক আকাশমনি গাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। কয়েক মাস ধরে সংঘবদ্ধ চোরচক্র রাতের আঁধারে এসব গাছ কেটে পাচার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সরকারি গাছ পাচার হয়ে গেছে, অথচ প্রশাসন এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে এখনো পর্যন্ত উদ্যোগ দেখাতে পারেনি। ফলে ক্ষোভ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বহরা ইউনিয়নের গিলাতলী চার রাস্তার মোড় থেকে খানকা শরিফ হয়ে চেঙ্গার বাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি আকাশমনি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। গাছগুলো ছিল বহু বছরের পুরোনো ও বড় আকারের। স্থানীয়রা জানান, রাত গভীর হলে চোরচক্র আধুনিক ইলেকট্রিক করাত ব্যবহার করে দ্রুত গাছ কেটে নেয় এবং ভোর হওয়ার আগেই ট্রাকে করে সেগুলো পাচার করে ফেলে। অথচ এত বড় অপকর্ম চলতে থাকলেও কোনো প্রকার নজরদারি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়নি।

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক আব্দুল করিম বলেন, “প্রতিদিনই ৪-৫টি সরকারি গাছ পাচার হতে দেখি। এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে নষ্ট হবে। রাস্তার পাশে ছায়াঘেরা গাছ না থাকায় এখন রোদে পথচারীদের চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে।” তার বক্তব্যে উঠে আসে স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি।

ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, গাছ চুরির সঙ্গে জড়িতদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পাঠানো হয়েছে প্রায় দশ দিন আগে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইউনিয়ন পরিষদ কোনোভাবেই এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। বরং তারা বাদী হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেছেন। কিন্তু প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় চোরচক্র বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

এদিকে, মাধবপুর উপজেলা প্রকৌশলী রেজাউন নবী জানান, তিনি ঘটনাটি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা দ্রুতই থানাকে অবহিত করব।” তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, ঘটনাটি এতটা সময় ধরে ঘটলেও উপজেলা প্রকৌশলীর অজ্ঞাত থাকা প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রমাণ বহন করে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেম বলেন, “রাস্তার পাশের গাছ কাটার বিষয়ে আমরা খোঁজ নিচ্ছি। ইতোমধ্যে অন্য একটি ইউনিয়নে এমন ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বহরা ইউনিয়নের ঘটনাটিও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তার বক্তব্যে কিছুটা আশার সুর থাকলেও এখনো বাস্তবে কোনো পদক্ষেপের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সহিদ-উল্লাহ বলেন, বন বিভাগ তাদের সহযোগিতা চাইলে পুলিশ প্রস্তুত আছে। তবে বিষয়টি থানার পক্ষ থেকেও খতিয়ে দেখা হবে। যদিও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটার এই প্রবণতা চললেও বন বিভাগ ও পুলিশ যৌথভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় যেমন ঘটছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদও প্রতিনিয়ত লুট হচ্ছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তার পাশের গাছ কেটে নেওয়া মানে শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীববৈচিত্র্যের হুমকি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মানের অবনতি। গাছ কেটে নেওয়ার কারণে গ্রামীণ সড়কে তীব্র গরমে চলাচল কষ্টসাধ্য হচ্ছে, বৃষ্টির সময় রাস্তার পাশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সড়ক ও আশপাশের এলাকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতা আসলে চোরচক্রকে উৎসাহিত করছে। প্রতি রাতে নতুন নতুন গাছ কাটা হচ্ছে অথচ টহল পুলিশ বা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নেই। বরং অনেকের ধারণা, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই গাছ পাচার অব্যাহত রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ অসহায়ভাবে শুধু দেখছে, কিন্তু প্রতিরোধের শক্তি পাচ্ছে না।

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই লিখেছেন, “যেখানে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় গাছ লুট হয়ে যাচ্ছে অথচ প্রশাসন নিশ্চুপ। এটা দেশের জন্য লজ্জাজনক।”

এলাকার মানুষ দাবি করছেন, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে গাছ চুরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে কাটা গাছের স্থলে নতুন করে গাছ লাগাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যায়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আহ্বান, প্রশাসনকে আর সময়ক্ষেপণ না করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই পুরো ঘটনাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় অব্যবস্থাপনা এবং দায়সারা মনোভাবের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে শুধু বহরাই নয়, দেশের অন্য জায়গাতেও একইভাবে রাস্তার পাশের মূল্যবান গাছগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, হবিগঞ্জের মাধবপুরে এলজিইডির রাস্তার অর্ধশতাধিক আকাশমনি গাছ চুরি শুধু একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি পরিবেশ, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত