দার্জিলিংয়ে বৃষ্টিজনিত বিপর্যয়, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭০ বার

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলায় কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। খবর পাওয়া গেছে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে। মৃতের মধ্যে মিরিক ও কালিম্পংয়ে ১৮ জন এবং নাগরকাটায় পাঁচজন। এই নিহতরা মূলত ভূমিধস ও ভেঙে যাওয়া সেতুর ধ্বংসের শিকার হয়েছেন।

ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে দার্জিলিং জেলায় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় বহু মানুষ সেখানে আটকা পড়েছেন। বিশেষত পর্যটকরা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। দার্জিলিং এবং আশেপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বহু পর্যটক ফাঁদে পড়ে ছিল। বৃষ্টি থামার পর তারা ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে নেমে আসতে শুরু করেছেন। তবে মূল রাস্তা বন্ধ থাকায় অনেকেই এখনও বিপাকে রয়েছেন।

দুর্যোগকালে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি তৎপর হয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আহত এবং অচেতন মানুষদের উদ্ধার করার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কাজ করছে। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে এবং উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় বৃষ্টি চলছেই। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই অবস্থায় নদী ও পাহাড়ি এলাকায় প্লাবন ও ভূমিধসের আশঙ্কা থেকে স্থানীয়দের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এই দুর্ঘটনাকে মানবসৃষ্ট বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি মৃতদের পরিবারের জন্য ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং প্রত্যেক পরিবারের একজন সদস্যকে হোমগার্ডের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মমতা বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর জরুরি পরিষেবা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিস্থিতি স্বেচ্ছায় তদারকি করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকেও দ্রুত উদ্ধারকর্মী, জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও পানীয় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

দার্জিলিং, নাগরকাটা এবং মিরিকের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের পাশাপাশি ছোট নদীগুলোও দ্রুত বন্যার পানি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়া গাছ, গাড়ি এবং বস্তাবন্দী মালামাল উদ্ধারকর্মীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে যেসব মানুষকে উদ্ধার করা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকে গুরুতরভাবে আহত। দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের কারণে কয়েকটি গ্রাম এবং ছোট শহর প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের আগে পর্যটকরা স্থানান্তর করতে পারছিলেন না। এতে পর্যটন শিল্পও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হোটেল ও লজগুলো জলমগ্ন হয়েছে, রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ে। এখন উদ্ধারকারীরা জলমগ্ন এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালাচ্ছেন।

উত্তরবঙ্গের কৃষক ও সাধারণ মানুষও এই বৃষ্টিপাতের কারণে বিপাকে পড়েছেন। বহু জমি প্লাবিত হয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে। অনেক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য, ঔষধ এবং অস্থায়ী আশ্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধস হওয়া স্বাভাবিক। তবে সম্প্রতি বৃষ্টির মাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণত যে এলাকায় ক্ষতি হয় না সেখানে ও ধ্বংস দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নত বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পর্যটক ও সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে স্থানীয় প্রশাসন সকল সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিচ্ছে। নদী ও পাহাড়ি এলাকা ঘুরে বিপদসীমার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি মনিটর করছেন এবং সম্ভাব্য বিপদ এড়িয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিচ্ছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সেনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দল যৌথভাবে কাজ করছে। খাদ্য, পানি, ঔষধ, অস্থায়ী আশ্রয় এবং চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, আরও ভূমিধস এবং নদী ভাঙনের ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দার্জিলিংয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়টি শুধুমাত্র মৃত ও আহত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, বরং পর্যটন শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রশাসন এবং সরকারের দ্রুত পদক্ষেপে উদ্ধার কাজ জোরদার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের জন্য এখনো সতর্ক থাকা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করে, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পর্যাপ্ত পূর্বসতর্কতা, বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং দ্রুত উদ্ধার কর্মসূচি না থাকলে বিপর্যয় কতটা ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com