প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফুটবল বিশ্বের একসময়কার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়রের ক্যারিয়ার যেন ধীরে ধীরে নিভে আসছে। যে ফুটবলারকে ব্রাজিলিয়ানরা ‘রাজপুত্র’ বলে ডাকত, যার পায়ের জাদু একসময় প্রতিপক্ষকে শিহরিত করত, এখন সেই নেইমার মাঠের বাইরেই সময় কাটাচ্ছেন ইনজুরি আর বিতর্কের ছায়ায়। চিকিৎসার বিছানায় শুয়ে থেকেও অনলাইন পোকার টুর্নামেন্টে রানার্সআপ হয়ে প্রায় ৭৩ হাজার ৮০০ পাউন্ড জেতার খবর হয়তো সাময়িক আনন্দ দিয়েছে তাঁকে, কিন্তু বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাত—২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর উঠেছে তাঁর সাবেক সতীর্থ উসমান দেম্বেলের হাতে। সেই ট্রফিটিই ছিল নেইমারের জীবনের সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণ স্বপ্ন।
একসময় ভেবেছিলেন, বার্সেলোনার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে প্যারিস সাঁ জার্মেই (পিএসজি)-তে গিয়েই হয়তো ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় লিখবেন গৌরবের অক্ষরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে পেলেন ব্যর্থতা, সমালোচনা আর ইনজুরির পাহাড়। এরপর নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে সৌদি ক্লাব আল হিলালে যোগ দিয়েছিলেন, সেখানে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে। কিন্তু সেই অধ্যায়ও শেষ হয়েছে হতাশায়। ইনজুরিতে জর্জরিত হয়ে মৌসুমের বেশিরভাগ সময়ই মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেইমার ফিরে আসেন নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে, ১২ বছর পর। উদ্দেশ্য ছিল নিজের হারানো ছন্দ ফিরে পাওয়া, নিজের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু বাস্তবতা আরও নিষ্ঠুর। ইনজুরির পুরনো ভূত তাঁকে ছাড়েনি এক মুহূর্তের জন্যও। এই মৌসুমে সান্তোসের প্রায় অর্ধেক ম্যাচেই মাঠে নামতে পারেননি তিনি। যে ক’টি ম্যাচ খেলেছেন, তাতেও ছিলেন নিজের ছায়া। নিচের সারির দলগুলোর বিপক্ষে করা কিছু গোল ও অ্যাসিস্টই এখন তাঁর সাম্প্রতিক সাফল্যের সবটুকু। এক সময়ের ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ড এখন সান্তোসের জার্সিতে নিছক এক প্রতীক, এক স্মৃতিচিহ্ন মাত্র।
এই অবস্থায় ২০২৬ বিশ্বকাপে নেইমারের উপস্থিতি এখন বড় এক প্রশ্নবোধক। ব্রাজিল দলের নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের দল ঘোষণা করেছেন—সেই দলে নেই নেইমারের নাম। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে তাঁর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর থেকে আর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ওঠেনি।
আনচেলত্তি অবশ্য আশার কথা বলেছেন, “নেইমারের লক্ষ্য হওয়া উচিত আগামী জুনে বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত থাকা। অক্টোবর বা মার্চে দলে থাকা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।” কিন্তু নেইমার নিজে বলেছেন ভিন্ন কথা, “আমাকে বাদ দেওয়ার কারণ ফিটনেস নয়, বরং টেকনিক্যাল।” এই বক্তব্যে বিতর্ক আরও বেড়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আনচেলত্তি দলের ভারসাম্য ও গতি বজায় রাখতে চাচ্ছেন; আবার অনেকে মনে করেন, নেইমারের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি অধিনায়ক কাফুর বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট, “যদি নেইমারের মতো একজন খেলোয়াড় টেকনিক্যাল কারণে বাদ পড়ে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, কিছু একটা ঠিক নেই।” তিনি যোগ করেন, “১৫ বছর ধরে নেইমারই ছিল ব্রাজিলের আশা-ভরসা। এখন সে টানা তিনটি ম্যাচ খেলতেও হিমশিম খায়—এটা কষ্টের।”
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটা ফোলহার এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান এখনও চান নেইমারকে দলে দেখতে, তবে ৪১ শতাংশ মনে করেন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার। এই পরিসংখ্যানই বোঝায়, নেইমার এখন বিভক্ত মতামতের প্রতীক—একদিকে অনুগত ভক্তদের আশা, অন্যদিকে ক্রমশ বাড়তে থাকা হতাশা।
সান্তোসে ফিরে আসার পর নেইমারের মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তাঁর মাঠের বাইরের আচরণ। পরাজয়ের পর কান্না, দর্শকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা, সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিরক্তি—সব কিছু মিলিয়ে যেন নিজেই নিজের প্রতিচ্ছবি হারিয়ে ফেলেছেন। এমনকি তাঁর বাবা ও এজেন্ট নেইমার সিনিয়রের বক্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “সান্তোসে ফিরে আসা ছিল শুধুই পুনরুদ্ধারের জন্য, পাঁচ মাসের পরিকল্পনা।” এতে সমর্থকদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—নেইমারের মনোযোগ আসলেই ফুটবলে আছে, নাকি ব্যক্তিগত প্রচারণায়?
তবু আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও ‘ফেনোমেনন’ বলেন, “নেইমারকে নিয়ে অনেকে সমালোচনা করে, কিন্তু তারা বোঝে না ইনজুরি থেকে ফিরে আসা কতটা কঠিন। আমি জানি, সে এখনও সঠিক পথে আছে।” তাঁর মতে, ব্রাজিলের দলে অভিজ্ঞতা ও প্রতিভার সমন্বয়ে নেইমার এখনও মূল্যবান সম্পদ হতে পারেন।
তবে বাস্তবতা হলো, নেইমার এখন ৩৩ বছরের কাছাকাছি। একজন ফুটবলারের জন্য এটি অবসরের প্রাক্কাল, বিশেষত যদি ইনজুরির ইতিহাস দীর্ঘ হয়। হাঁটু, অ্যাঙ্কেল ও পিঠের সমস্যা তাঁকে প্রায় পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই ভুগিয়েছে। চিকিৎসক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নেইমারের পুনরায় পূর্ণ ফিটনেসে ফেরা এখন অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে আগামী বছরের মাঝামাঝি বিশ্বকাপের আগে।
এদিকে ব্রাজিল দল বর্তমানে দ্রুত রূপান্তরের পথে। ভিনিসিউস জুনিয়র, রদ্রিগো, এনড্রিক, মার্টিনেলির মতো তরুণরা আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। এই নতুন প্রজন্মের আগমনে নেইমারের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আনচেলত্তির কৌশলগত চিন্তায় এখন দ্রুতগতি, প্রেসিং আর দলীয় ভারসাম্যই মুখ্য—যেখানে একজন বয়সী, ইনজুরি-প্রবণ ফরোয়ার্ডের জায়গা পাওয়া কঠিন।
তবে ইতিহাস বলে, ব্রাজিল কখনো তার প্রতীক হারাতে চায় না। পেলেকে যেমন ১৯৭০ সালে শেষ সুযোগ দিয়েছিল, তেমনি ২০২৬ সালেও হয়তো নেইমারকে দেখা যেতে পারে তাঁর শেষ বিশ্বকাপে, প্রতীকী উপস্থিতিতেই হোক বা সীমিত ভূমিকা নিয়েই। ব্রাজিলের অনেক সমর্থক এখন সেই আশাতেই বুক বাঁধছেন।
ব্রাজিলের সাবেক কোচ তিতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নয়, সে ব্রাজিলীয় ফুটবলের আবেগ।” তাই তাঁকে ছাড়া বিশ্বকাপ কল্পনাই করা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা যদি নিষ্ঠুর হয়, তবে হয়তো এই বিশ্বকাপই হবে সেই টুর্নামেন্ট যেখানে নেইমার শুধু দর্শক হয়ে দেখবেন, অন্য কেউ তাঁর স্বপ্ন পূরণ করছে।
আজ নেইমার হয়তো অনলাইন পোকারের টেবিলে বসে থাকবেন, বা ইনজুরির পুনর্বাসন ক্লিনিকে ব্যথা সহ্য করবেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণে এখনও একটাই প্রশ্ন ঘুরবে—“আমি কি ফিরে আসতে পারব?” ফুটবল দুনিয়া এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে। সময় হয়তো এখনও ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু বালিঘড়ির শেষ দানাগুলো দ্রুতই ঝরে পড়ছে ব্রাজিলের রাজপুত্রের জীবনের মঞ্চে।